একজন সাইফুর রহমান

0

জিসাফো ডেস্কঃ (১৯৩২-২০০৯)  চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট, রাজনীতিক। সাইফুর রহমান ১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন  গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল বাছিত এবং মা তালেবুননেসা। তিনি ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ  থেকে আই.এ পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি লন্ডনে পড়াশুনা করেন (১৯৫৩-১৯৫৮) এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। সাইফুর রহমান ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাইফুর রহমান ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং এক মাস কারাবরণ করেন। তিনি ৩ পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। ২০০৩ সালে তার স্ত্রী ইন্তেকাল করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান জাতীয় বেতন কমিশনে প্রাইভেট সেক্টর হতে একমাত্র সদস্য মনোনীত হন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ছিলেন।

সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। এ দলটিই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) রূপান্তরিত হয়। তিনি ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মৌলভীবাজার সদর এলাকা থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশে মুক্ত বাজার সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রবর্তক হিসেবে সমধিক পরিচিত। ১৯৭০- এর দশকের শেষের দিক থেকে এ প্রক্রিয়া চালু হয়।  তিনি ১৯৯৬ সালে  এবং পুনরায় ২০০১ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো করের পরিসর বৃদ্ধি করে মূসক (মূল্য সংযোজন কর) প্রথা প্রবর্তন করেন। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিকে তিনি ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। এছাড়াও ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভাসমান মুদ্রাবিনিময় হার নীতিমালা প্রণয়ন, বাণিজ্য উদারিকরণ, বেসরকারীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন  এবং  শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর সূচনা করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৮০ থেকে ১৯৯৬ সাল মেয়াদে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (ইইসি), এশিয়া ও প্যাসেফিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ), কমনওয়েলথ এবং জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বাংলাদেশের অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৯৫ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া ঐ বছর বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সম্মেলনেও তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এ বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। ১৯৯৪ সালে মাদ্রিদে  অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

সাইফুর রহমান ১৯৬২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতমানের ‘রহমান হক’ নামীয় একটি নিরীক্ষা ফার্ম। এছাড়া তিনি কেমিক্যাল, তেল-গ্যাস উত্তোলন, ট্রান্সপোর্ট, ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট  অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর প্রিন্সিপাল এবং বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ  ২০০৫ সালে সাইফুর রহমানকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

সাইফুর রহমানের আত্মজীবনী গ্রন্থ কিছু কথা কিছু স্মৃতি ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়। এ বইতে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের অকথিত বিষয়সহ বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাজনীতিক সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেন।

তিনি ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার ঢাকা-সিলেট মহা সড়কের খড়িয়ালা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী বাহারমর্দনে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। সাইফুর রহমান দীর্ঘদিন দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন ছাড়াও দেশ-বিদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে। তার জীবদ্দশায় দেশ ও বৃহত্তর সিলেট নিয়ে যে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা করেছিলেন, তার অনেকগুলো বাস্তবায়ন হলেও পুরোটা বাস্তবায়ন করতে পারেন নি। হঠাৎ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ, স্তব্ধ হয়ে যায় তার দেখা উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার স্বপ্ন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাবেক এমপি ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান জানান, তার পিতা সব সময়ই মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পছন্দ করতেন। বৃহত্তর সিলেটে তিনি যে দৃষ্টান্তকারী উন্নয়ন করে গেছেন এটিই তার বড় প্রমাণ।

মোঃ আলফাজ উদ্দিন