একজন রাষ্ট্রনায়ক ও একজন শহীদের মা – কারার মাহমুদুল হাসান

0

“ একজন রাষ্ট্রনায়ক ও একজন শহীদের মা”

লেখক:  কারার মাহমুদুল হাসান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব, বিজ্ঞান ও তথ্য যোগযোগ মন্ত্রনালয়।

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৭ সাল।

“কারার সাহেব, ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে মাঠে ময়দানে, ঘরে বাইরে ভাষা শহীদদের নাম উচ্চারিত হয় বিশেষ করে ফেব্রুয়ারী মাসে। বক্তৃতা বিবৃতির ঝড় বয়ে যায়, কিন্তু তাদের পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজন আপন জন রা কে কোথায় আছে সে সম্পর্কে তো কেউ কিছু বলে না” কোন প্রশ্ন না যেন জনান্তিকেই জিয়া কথা বলে যাচ্ছিলেন।

“পত্র পত্রিকায় দেখি প্রতি বছর শহীদ দিবস কে উপলক্ষ্য করে বরকতের মা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে আসেন। সপ্তাহ দুয়েক পরই ২১ শে ফেব্রুয়ারী এ বছর ও হয়ত শহীদ বরকতের মা বাংলাদেশে আসবেন। আপনি কি বরকতের মার সাথে আমাদের একটি সাক্ষাৎকারের ব্যাবস্থা করতে পারবেন? আমি তার সাথে কথা বলতে চাই।“

আমি তার আগ্রহ দেখে বললাম, “ সে যদি এ বছর বাংলাদেশে আসেন অবশ্যই তার সাথে আপনার সাক্ষাতের ব্যাবস্থা করব।

প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে বের হয়ে শুরু হল শহীদ বরকতের নিকট আত্মীয় স্বজন দের খুজে বের করার পালা। বাংলা একাডেমী থেকে জানতে পারলাম শহীদ বরকতের মা বাংলাদেশে আসলে কার বাসায় থাকে। জানতে পারলাম –

শহীদ বরকতের মা হাজী হাসিনা বিবি বাংলাদেশে আসলে গাজীপুর (জয়দেবপুর) তার নাত জামাইয়ের বাড়ীতে ওঠেন। সেই নাত জামাই আবার তখন সচিবালয়ের এক নিম্ন পদে চাকুরী করেন। তার খোজ নিয়ে তাকে আমার বাসায় ডেকে পাঠালাম। উনি জানালেন শহীদ বরকতের মা এক সপ্তাহ হল বাংলাদেশে এসে তার বাসায় উঠেছে। পরদিন ই প্রেসিডেন্টের সাথে আমি হাজী হাসিনা বিবির সাক্ষাৎকারের ব্যাবস্থা করলাম।

বরকতের মা বার্ধক্য জনিত কারনে অসুস্থ্য ছিলেন কথা জড়িয়ে যেত। তাতে কি তার যে সন্তানের সাথে কথা হচ্ছে। জিয়া সেই মুহুর্তে ছিলেন বরকতের মায়ের আর এক ছেলে।

“মা আপনার জন্য কি করতে পারি” এক কৃতজ্ঞ ছেলে তার মাকে জিজ্ঞেস করে।

“বাবা আমি মুর্শিদাবাদের মানুষ সেখানে আমার বিষয় সম্পত্তি আছে, কিন্তু আমার বাবা বরকত যেখানে ঘুমিয়ে আছে আমিও সেখানে জীবনের শেষ দিন গুলো কাটাতে চাই।“

“ব্যাবস্থা হবে মা” জিয়ার বিনয় অবনত জবাব।

এর পর আরো কিছুক্ষন তাদের মাঝে কথা হয়। জিয়া দোয়া চাইলেন শহীদ মাতার কাছে। দু হাত তুলে চোখের পানি ফেলে বৃদ্ধা আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেন। এর পর জিয়া তার পকেট থেকে একটি খাম বের করে শহীদ মাতাকে দিলেন, বললেন “মা এখানে দশ হাজার টাকা আছে”। চলাফেরায় অসুস্থ্য হাসিনা বিবিকে তার নাত জামাই কোলে করে গাড়িতে নিয়ে আবার জয়দেবপুর ফেরত যায়।

রাষ্ট্রপতি আমাকে নির্দেশ দেয় হাজী হাসিনা বিবিকে এক একর খাস জমি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেবার জন্য। জয়দেবপুরের মৌজা নলজানি ১নং খতিয়ানের ৩৭৩ দাগে মোট ৬৮ শতক জমি চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ দেয়া হয়। ১৯৮২ সালের ২০ এপ্রিল শহীদ জননী ইন্তেকাল করলে ঐ জমিতেই তাকে দাফন করা হয়।

মানিকগঞ্জে ভাষা শহীদ রফিকের মার কবর পাকা করে দেয় রাষ্ট্রপতি জিয়া তার নিজস্ব তহবিলের অনুদান থেকে।

এই ছিল আমার আদর্শ শহীদ জিয়া, লোক দেখানো কিছুর থেকে নিভৃতে ছিল যার পদ চারনা।

লেখক জনাব কারার মাহমুদুল হাসান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব, বিজ্ঞান ও তথ্য যোগযোগ মন্ত্রনালয়।

Edited & Published By: Zubair Tanvir Siddique