একজন পুলিশ কর্মকর্তার কিছু কথা

0

জিসাফো ডেস্কঃ ‘চাকরিতে প্রবেশকালে যখন শপথবাক্য পাঠ করেছিলাম তখন সততার বাণীগুলো শুনে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে তখন মনে মনে শপথনামা যথাযথভাবে মেনে চলবো বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। কিন্তু পরে রুঢ় বাস্তবতায় প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পারিনি। স্রোতের পানির মতো আমিও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে বাধ্য হয়েছি।’

ঢাকা মহানগরীর একটি থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা যিনি কিছুদিন আগেও মাঠপর্যায়ে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। একান্ত আলাপকালে তিনি পুলিশবাহিনীর নাম, বদনাম, ক্ষোভ ও দুঃখের কথা জানান।

তবে নিজের নাম প্রকাশ না করার ‘কঠিন’ শর্তেই এসব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, পুলিশ বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের (পাবলিক ফাংশন) সরাসরি যোগাযোগ বেশি হওয়ায় দোষক্রুটি বেশি চোখে পড়ে।

উদাহারণ টেনে তিনি বলেন, পুলিশ কোনো অপরাধে কাউকে ধরে আনলে আইনের হাত থেকে বাঁচতে আসামিপক্ষের নিকটাত্মীয়রা ছুটে আসেন। অনেক সময় বাদীর সঙ্গে সমঝোতা করে মামলা তুলে নেন। থানা থেকে যাওয়ার সময় খুশি হয়ে মিষ্টি খেলতে দিলাম বলে পুলিশকে নগদ কিছু টাকা দিয়ে যায়। কিন্তু বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনকে জানায়, ‘পুলিশকে ঘুষ দিয়ে ছাড়িয়ে আনলাম’।

তিনি বলেন, কোন পেশার মানুষ ঘুষ খায় না বলতে পারেন? ব্যাংক থেকে লোন নিতে গেলে মোট টাকার একটা অংশ ঘুষ না দিলে লোন পাস হয় না। জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের নির্দিষ্ট অংকের টাকা না দিলে নানা অজুহাতে জমি রেজিস্ট্রি করতে বিলম্ব করে। শিক্ষকদের কাছে কোচিং না করলে পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দেয়।

তিনি আরো বলেন, প্রাইমারি স্কুলে সরকারিভাবে যে উপবৃত্তি দেয়া হয় সেখানেও দুর্নীতি হয়। খাতাকলমে টাকা পয়সা বণ্টনে এক রকম দেখানো হয় বাস্তবে হিসেব আরেক রকম। আদালতও অভিযোগমুক্ত নয়! সাংবাদিকদের মধ্যেও কারো কারো বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আবার না করেও ঘুষ নেয়ার অভিযোগ আছে।

তার দাবি- কেবল পুলিশকে দোষ দিয়ে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য সর্বাগ্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, এমপিরা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ফুটপাত উচ্ছেদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করছেন। আবার পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টেলিফোন করে ফুটপাত উচ্ছেদ হলে ওই সকল গরিবরা না খেয়ে মরবে, কাজ না করলে চুরি ও ছিনতাই করবে, দায় পুলিশের ওপর বর্তাবে এ জাতীয় কথা বলে প্রকারান্তরে পুলিশকে অঘোষিত থ্রেটও করছেন!

তিনি জানান, ফুটপাথ থেকে পুলিশ বখরা নেয় এমন অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে টাকা নেয় সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সাংসদ ও রাজনীতিবিদদের আশীর্বাদপুষ্ট কথিত পাতি নেতারা। তাদের পড়াশোনা নেই।

তিনি আরো জানান, পুলিশের গাড়ি যখন টহল ডিউটিতে যায় খন ওই পাতি নেতারা ছুটে আসে। তারা পুলিশকে যত্ন করে চা বিস্কুট খাইয়ে হ্যান্ডশেক করে বিদায় দেয়। পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর পাতি নেতারা শাসিয়ে বলেন, ‘দেখলিতো কতো কানেকশন আমার, চলে যাওয়ার সময় টাকা দিতে হয়েছে।’ সাংবাদিকরাও গণহারে পুলিশের ওপর দোষ চাপায়।

তিনি বলেন, আমি বলবো না পুলিশ ঘুষ খায় না। তবে বলবো সব পুলিশ এক রকম নয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কারো মনে কষ্ট দিয়ে টাকা খান না বলেও দাবি করেন।

চলে আসার সময় তিনি বলেন, ঢাকা শহর থেকে ফুটপাত উচ্ছেদ করা পুলিশের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহর থেকে ফুটপাত উচ্ছেদ করা সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক প্রয়োজনেই পাতি নেতাদের বিরুদ্ধে তারা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না বলেও জানান তিনি।