উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নজর নেই সরকারের

0

জিসাফো ডেস্কঃ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নজর নেই সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর। এজন্য একের পর এক অজুহাতে আটকে আছে সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন। চলতি অর্থবছরের ৪ মাসে (জুলাই থেকে অক্টোবর) উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা, যা মূল এডিপির ১১ শতাংশ।

অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়নে হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণ হিসেবে বৃষ্টিকে দায়ী করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কয়েকদিন আগেও এডিপি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা সভায় পাথরের সংকটকে এডিপি বাস্তবায়নে বাধা বলে জানিয়েছিলেন সেতু বিভাগের প্রতিনিধিরা। ওই সভায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৯৯৭ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। এ হিসেবে মূল এডিপির ১১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে ৪ মাসে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এডিপি বরাদ্দের ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ব্যয় হয়েছিল মোট বরাদ্দের ১৪ শতাংশ অর্থ। এর আগের অর্থবছরের চার মাসে ২০ শতাংশ এডিপি ব্যয় হয়েছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ১৫ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এ হিসাবে এবারই এডিপি বাস্তবায়ন সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে।

আইএমইডির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিটি অর্থবছরের শুরুতেই এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যায়। এমনকি পর্যাপ্ত অর্থব্যয় না হওয়ায় বছরের মাঝামাঝি সময়ে এডিপির আকারও কমিয়ে আনা হয়। অর্থ ফেরত যাওয়ার ভয়ে বছরের শেষ দিকে এসে বেহিসাবি অর্থ ব্যয় করে বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। একসঙ্গে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ায় প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ আসে অর্থ অপচয়েরও।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বছরের শুরুর দিকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়ে আসছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে জানিয়েছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।

বরাদ্দে শীর্ষ ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন চিত্রে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৫২১ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর ৪ মাসে ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাস্তবায়নের হার ১৪ শতাংশ। প্রথম চার মাসে বরাদ্দের ১৫ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৬২২ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে বরাদ্দের ১৫ শতাংশ অর্থ।

এর বাইরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৩ শতাংশ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ১৮ শতাংশ, সেতু বিভাগ ৬ শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১০ শতাংশ, রেলপথ মন্ত্রণালয় ৬ শতাংশ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ৮ শতাংশ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে।

আইএমইডির এক কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুসারে বছরের প্রথম থেকেই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করার কথা। কিন্তু তা না করে বছরের শেষের দিকে এসে জোর দিয়ে অর্থ ব্যয় করা হয়। এক কথায় বলা চলে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মন নেই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর। এ অবস্থার উন্নয়ন করা না গেলে সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জামান বলেন, ‘সবসময় অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নের হার সর্বনিম্ন দেখা যায়। এটা হয় আমাদের উন্নয়ন প্রশাসনের সমস্যার কারণে। তারা সময়মতো অর্থছাড় দেয় না। এ কারণে প্রকল্পগুলোর কাজ হাতে নেয়া যায় না। আমাদের উন্নয়ন প্রশাসনকে আরো উন্নয়নমুখি হতে হবে। তা না হলে এ ধারা থেকে বের হওয়া যাবে না।’

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৯৯৭ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করেছে সরকার। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে ৬২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন সহায়তা বাবদ দাতা সংস্থার কাছ থেকে আসবে ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বাইরে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে আরও ৩ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা।