উত্তরা গণভবনের জমি দখল করে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়!!!!

0

জিসাফো ডেস্কঃ নাটোরে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় কার্যালয় ঐতিহাসিক উত্তরা গণভবনের সামনের জায়গা দখল করে এক আওয়ামী লীগ নেতা গড়ে তুলেছেন দলীয় কার্যালয়। খন্দকার ওমর শরীফ চৌহান নামে এই আওয়ামী লীগ নেতা অর্ধকোটি টাকা মূল্যমানের জায়গাটি দখল করে গড়ে তুলেছেন দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়। কেবল তা-ই নয়, রাজা প্রসন্ন নাথের এস্টেট ম্যানেজারের ৩০০ বছরের প্রাচীন বাসভবনটিও দখল করে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ নামে আরেকটি কার্যালয় খুলে বসেছেন তিনি।

তবে সদর উপজেলার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় করা হলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এ ইউনিয়নের শাসকদলীয় নেতারা! আসন্ন দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদের একজন প্রার্থী হিসেবে নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি কাড়তেই চৌহান এসব কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে অবৈধভাবে পাকা কার্যালয়টি তৈরি করায় উত্তরা গণভবনের সৌন্দর্যহানি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলেও প্রভাবশালী এ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসন উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসী জানান, প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবন রাজধানীর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত। রাজা প্রসন্ন নাথ রায় বাহাদুর ১৭৫৭ সালে রাজদরবার হিসেবে নির্মাণ করেন ভবনটি, যা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর শেষ রাজা প্রতিভা নাথ রায় দেশ ত্যাগ করে চলে যান। এরপর পাকিস্তান আমলে এটিকে পূর্ববাংলার গভর্নর হাউস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে এটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্তরা গণভবন (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) ঘোষণা করেন। এখানে তিনি নিজে একাধিকবার রাতযাপনের পাশাপাশি ক্যাবিনেটের সভাও করেন। ঢাকায় অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন ও উত্তরা গণভবন একই মর্যাদাসম্পন্ন। এখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারও থাকার সুযোগ নেই। এমনকি ক্যাবিনেটের কোনো সদস্যেরও (মন্ত্রী) না। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মাত্র ৫০ গজ দূরে প্রায় ১৫ শতাংশ জমি অবৈধভাবে দখল করে দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের দলীয় পাকা কার্যালয় গড়ে তুলেছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য ওমর শরীফ চৌহান। দখলকৃত জমিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। নান্দনিকতায় পূর্ণ মূল ফটকের সামনের একপাশে শোভা পাচ্ছে সরকারদলীয় হাইব্রিড নেতা ওমর শরীফ চৌহানের বিশাল বিশাল ব্যানার। তার প্রচারের কবল থেকে বাদ যায়নি এখানকার শহীদ স্মৃতিস্তম্ভও। পুরো স্মৃতিস্তম্ভে লাগানো হয়েছে ছোট বিলবোর্ড সাইজের ব্যানার। স্মৃতিস্তম্ভের মূল ফটক ছাপিয়ে গেছে সেগুলো। বেশির ভাগ ব্যানারই তার শুভেচ্ছা ও সালাম দেওয়ার জন্য টানানো হয়েছে। সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির একজন সদস্য হিসেবে তাকে সবাই চিনত ও জানত। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তিনি কোনো দিনই জড়িত ছিলেন না।

৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর এক আত্মীয়ের বদান্যতায় রাতারাতি আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন চৌহান। কোনো দিন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে গোটা ইউনিয়নে বড় বড় বিলবোর্ডে টাঙিয়ে নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন চৌহান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, উত্তরা গণভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে সরকারি জায়গা দখল করে আওয়ামী লীগ কার্যালয় করার ব্যাপারে অনেকে নিষেধ করলেও চৌহান কর্ণপাত করেননি। বরং তিনি গণভবনের বাইরের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ভবন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মসহ নানা ভুঁইফোড় সংগঠনের নামে দখল করেছেন। ওমর শরীফ চৌহানের উত্তরা গণভবনের জায়গা দখলের বিষয়টি নাটোরে এখন ‘টক অব দ্য টাউন’। চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য তিনি পাঁচ লক্ষাধিক টাকা খরচ করে কার্যালয়টি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় মুখর এখন এলাকাবাসী।
২ জানুয়ারি উত্তরা গণভবন চত্বর ঘুরে দেখা যায়, প্রধান ফটকের সামনের প্রায় চার একর আমবাগান জুড়ে খড়ির আড়ত ও বসতবাড়ি অটুট রয়েছে। আমবাগান ঘিরে কিছু সীমানা পিলার বসানো হলেও সেখানে নেই কোনো কাঁটাতার বা প্রাচীর। পরিবেশ উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। প্রধান ফটকের সামনে এখনো রয়েছে বেশ কিছু ঝুপড়ি দোকান, যা ওমর শরীফ চৌহান বসিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। আর এসব ঝুপড়ি দোকান পেরিয়ে দেশ-বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ঢুকতে হয় গণভবনে। উত্তরা গণভবনের ৪৪ দশমিক ৩ একর জমির অনেকটাই এখন দখলদারদের কবলে।
দিঘাপতিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী শরিফুল ইসলাম বিদ্যুৎ জানান, উত্তরা গণভবনের সামনে দলের ইউনিয়ন কার্যালয় করা হয়েছে বলে তারা শুনেছেন। কিন্তু ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। এ ক্ষেত্রে তাদের মতামতও নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি ওমর শরীফ চৌহান।
উত্তরা গণভবন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের নাটোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান আকন্দ জানান, গণভবন সংরক্ষণের জন্য নাটোরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে। দখল এবং দলীয় কার্যালয় নির্মাণের বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। তারা গণভবন সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। আওয়ামী লীগ কার্যালয় নির্মাণের ব্যাপারে তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি। নির্মাণ বন্ধে অবৈধ দখলদারদের মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা কর্ণপাত করেননি।
নাটোরের জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান জানান, উত্তরা গণভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে আওয়ামী লীগের পাকা কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে বলে তিনি শোনেননি। এ বিষয়ে কিছু তিনি জানেনও না। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে ২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সোয়োমটো রুল জারি করেন। ওই রুলে উত্তরা গণভবনের জায়গা দখল করে নির্মিত অবৈধ স্থাপনাগুলো সাত দিনের মধ্যে অপসারণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন সে সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর দখল বন্ধ ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যালয় স্থাপনার মধ্যদিয়ে পুনরায় দখল শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।