ইয়াবা আসছে নৌকা ভরে!!

0

এক.

কক্সবাজার থেকে এসেছিলেন আমাদের এক সাংবাদিক সহকর্মী। বিষণœ তিনি। জিজ্ঞেস করলাম, কক্সবাজারের খবর কী? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ভালো। ৯ দিন বন্ধ। তার ফলে থৈ থৈ পর্যটক। হোটেলে রুম পাওয়া যাচ্ছে না। বিমানের ভাড়া দ্বিগুণ হয়েছে। দালাল চক্র আগেই বেশি দামে বিক্রি করার জন্য রুম বুকিং দিয়ে রেখেছে। ফলে যাদের আগে বুকিং দেয়া নেই, তাদের গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ রুম ভাড়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি। পর্যটকের চাপে বাড়ি থেকে বের হওয়াই মুশকিল। আমি বললাম, বেশ তো। ব্যবসা-বাণিজ্য দারুণ জমে উঠেছে। এখন তো ঢাল সিজন। তার মধ্যে কয়েক দিনের রমরমা বাণিজ্য মন্দ কী! তিনি হাসলেন। হ্যাঁ, বাণিজ্য ভালোই হচ্ছে। এই ৯ দিন পর পর্যটকের আনাগোনা কমে যাবে। হোটেল ভাড়া কমে যাবে। রেস্তোরাঁর কর্মচারীও কমবে। খানিকটা চুপচাপ হয়ে যাবে কক্সবাজার।

তারপর ভদ্রলোক আবারো চুপ হয়ে গেলেন। বললেন, পর্যটক আনাগোনা তো কক্সবাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। কক্সবাজারের অর্থনীতিও পর্যটক-কেন্দ্রিক। এখানে পর্যটকদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বড় বড় পাঁচ তারকা হোটেল। গড়ে উঠেছে নানা সুখাদ্যের রেস্তোরাঁ। বিনোদনের আরো নানা আয়োজন। কক্সবাজারের বিনোদন-বাণিজ্যের কথা তাই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু কক্সবাজারের দৃশ্যপট এখন একেবারে বদলে গেছে। পর্যটন-বাণিজ্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে নতুন বাণিজ্য, নতুন অর্থনীতি। যা শুধু কক্সবাজার নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যৎই অন্ধকার করে তুলছে। আর তা হলো মারণ নেশা ইয়াবা। এমনিতেই হেরোইন-ফেনসিডিল যুবসমাজকে এক দফা শেষ বা পঙ্গু করে দিয়েছে। যারা হেরোইনের পাল্লায় পড়েছে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। আমাদের একটা জেনারেশনের সর্বনাশ হয়ে গেছে। এখনকার জেনারেশনকে শেষ করে দেয়ার জন্য এসেছে এই ইয়াবা।

কোন পথে ইয়াবা আসছে না। মিয়ানমার থেকে নৌকা ভর্তি করে ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে। আমদানিপণ্যের ভেতরে আসছে। বস্তার ভেতরে আসছে। ইয়াবা ভর্তি বস্তা ওপার থেকে এপারে ভেসে আসছে। যার উদ্দেশে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে, সে ব্যক্তিই তা তুলে নিয়ে বীর দর্পে হেঁটে চলে যাচ্ছে। কেউ তাকে বাধা দিচ্ছে না। কোনো কিছু জিজ্ঞেস করছে না। ওপারের নাসাকা বাহিনী ও সীমান্তরক্ষীদের জ্ঞাতসারেই ঘটছে এ ঘটনা। ইয়াবা আয়ের কমিশন তারাও পাচ্ছে। এপারের অবস্থাও একই। সব জায়গায় আছে কমিশনের খেলা। ইয়াবা ভর্তি যেসব নৌকা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে, কমিশনের খাতিরে সেগুলো আসে নির্বিঘ্নে। তাদের দিকে কোনো গুলি ছোড়ে না মিয়ানমারের বিজিপি বাহিনী। বেশি দূর যেতে হয় না। টেকনাফ স্থলবন্দরের আশপাশে দাঁড়ালেই এর সত্যতা চোখে পড়বে।

টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ৮০ কিলোমিটারের মতো পথ। গোটা পথেই ইয়াবার কারবার। ওই পথে সম্ভবত এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে ইয়াবার কারবারি নেই। এই কারবারে আছে সোর্স আর বাহক। সোর্স প্রশাসনকে জানান দেয়, অমুক পথে আসছে ইয়াবা। অমুক বাহক আনছে। কিন্তু বাহকের কাছে যদি প্রভাবশালী কারো টোকেন থাকে, তাহলে সে নির্বিঘেœ পার হয়ে যাবে। যার যার কমিশন যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছে যাবে। এই বাণিজ্যে এখন জড়িয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের লোক। মাঝে মধ্যে দেখা যায়, ইয়াবাসহ ধরা পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য। আমার ওই সহকর্মীর মতে, সেটা বিশ্বাস ভঙ্গের সাজা। ধরা যাক এক লাখ পিস ইয়াবা ধরা পড়েছে। তার মধ্যে বণ্টন নীতিমালা অনুযায়ী, ১০ হাজার পিস সরকারের খাতায় জমা হবে। বাকি ৯০ হাজার পিস আটককারী ও তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমানে সমানে ভাগ হবে। সোর্স জানে, কত হাজার পিস ইয়াবা এসেছিল। দেখা গেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে সদস্যরা তা আটক করেছেন, তারা বললেন, আটক হয়েছে ৩০ হাজার পিস। আর বাঁটোয়ারা হলো তার মধ্যে। এই অতি লোভের কারণেই কেউ কেউ কখনো কখনো ধরা পড়ে। আসলে যে পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তার ১ শতাংশও ধরা পড়ে কি না সন্দেহ।

এ তো গেল আগমনের দিক। এরপর আছে এর বণ্টনের দিকও। ইয়াবা তো এলো, কিন্তু এগুলো ভোক্তার কাছে পৌঁছবে কী করে? এর জন্য নিয়োজিত আছে হাজার হাজার বাহক। ইয়াবা ডিলারের কাছে ফোন করে দিলে ডিলার বাহকের মাধ্যমে পৌঁছে দেবে ইয়াবাসেবীর দোরগোড়ায়। এই বাহকেরা হতে পারে ছাত্র, কৃষক, নৌকার মাঝি, রিকশাচালক, ইজিবাইক চালক, সিএনজি চালক, চায়ের দোকানদার, মুচি, নাপিত কিংবা যে কেউ।

এক নিঃশ্বাসে এ পর্যন্ত বলে থামলেন আমার সাংবাদিক সহকর্মী। তারপর স্বগতোক্তির মতো বললেন, তার আশপাশে যত বাড়িঘর আছে, পরিবার আছে, তাদের প্রত্যেক সদস্য এই ইয়াবা-বাণিজ্যের সাথে যুক্ত। যে খায়, সেও যুক্ত। যে খায় না, সেও যুক্ত। ইয়াবা-বাণিজ্য মানেই হাজার হাজার কাঁচা টাকা। একজনে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে দেখে ১০ জন আকৃষ্ট হচ্ছে। পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, কেমন করে অতি নিম্ন আয়ের মানুষ ইয়াবা-বাণিজ্যে শরিক হয়ে সুরম্য প্রাসাদে বসবাস করছে। এসব বিত্তবৈভব অন্যদের আকৃষ্ট করছে রাতারাতি বড়লোক হতে। আর এসব অবৈধ বিত্তের মাধ্যমে তারা একদিন জনপ্রতিনিধি হবে। ইয়াবার অবৈধ বাণিজ্য আরো প্রসারিত হবে।

সাময়িক প্রচণ্ড শক্তি উৎপাদনকারী ও ঘুম-তাড়ানিয়া ইয়াবা এখন শুধু মিয়ানমার থেকে আমদানিই হচ্ছে না, ইয়াবার কারখানা এখন বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে। ছোট একটা বাথরুম আকারের জায়গায় এই কারখানা গড়ে তোলা যায়। সেভাবেই গড়ে উঠছে কারখানা। ধ্বংসের অতলগহ্বরের দিকে ছুটে যাচ্ছে যুবসমাজ। সরকার শুধু উন্নয়ন উন্নয়ন করছে। বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাচ্ছে। অবিরাম মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। বাকস্বাধীনতা হরণ করছে। গুম-খুন-ধর্ষণ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তারুণ্য ভেসে যাচ্ছে মারণ নেশায়। সে দিকে সরকারের কোনো দৃষ্টি নেই। সরকার পরামর্শ দিচ্ছে- নিজের সন্তান যেন বিপথে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। কিন্তু একটি ২২ বছরের সন্তান, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়, তার দিকে পিতামাতা বা অভিভাবক কিভাবে খেয়াল রাখবেন। কিন্তু দৃঢ় হাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করার যে দায়িত্ব সরকারের আছে, সে দায়িত্ব সরকার পালন করছে না। ভাবখানা এমন, তারুণ্য চোখ ঘোলাটে করে থাকুক নেশায়, আমরা প্রতিবাদহীন ক্ষমতায় আসীন থাকি।

দুই.
ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ ভ্রমণ শেষে ঢাকা ফিরছিলাম। কুয়ালালামপুরে সাড়ে ৪ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি। মালিন্দো বিমানের ১৮০ সিটের ১৬০ জনই সম্ভবত ছিলেন বাংলাদেশী। বিমানে তেমন একটা খেয়াল করিনি। ট্রানজিটে নেমে কারো কারো সাথে কথা হলো। পরে তারা ডিউটি ফ্রিতে শপিংয়ে চলে গেলেন। সি৬ গেটের সামনে আমি ও আমার স্ত্রী। এক সময় আরো দু’জন এলেন। একজনের বাড়ি ফেনী। আরেকজন সাভারের আমিনবাজারের বাসিন্দা। সিমেন্ট ব্যবসায়ী। আমিনবাজারের ব্যবসায়ীই বেশি কথা বললেন। রাজনীতি, সমাজ, মাদক- এমন নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। মাদকের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। বললেন, সমাজের সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। চার দিকে মাদক আর মাদক, ইয়াবা আর ইয়াবা। যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাহলে সমাজ-সংসার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মাদকের ছোবল থেকে আমি আমার সন্তানদের কিভাবে রক্ষা করব?

তারপর তিনি একটি কাহিনী বললেন। বললেন, সাভার-আমিনবাজার এলাকার মানুষ কোনো-না-কোনোভাবে পরিবহনের সাথে যুক্ত। কেউ বাস-ট্রাকের মালিক। কেউ ড্রাইভার, কেউ হেলপার। কেউ ট্রাক থেকে মাল নামায়। কেউ মাল তোলে। একজন মালিক এক সময় লক্ষ করলেন, তার ট্রাকের ড্রাইভার মাল চুরি করে। একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মাল আনার জন্য তিনিও ড্রাইভারের সাথে রাজশাহী যাবেন এবং গেলেন। মাল তোলা হলো। তুলতে তুলতে রাত ১১টা। মাল তোলা শেষ। মালিক ড্রাইভারকে বললেন, ট্রাক চালাও। ড্রাইভার ট্রাক চালায় না। স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঝুঁকে শুয়ে থাকে। যারা ট্রাকে মাল তুলে দিয়েছিল, তারা বলল- স্যার, ওর ইয়াবার জন্য ৫০০ টাকা দেন। নইলে ও গাড়ি চালাতে পারবে না। তিনি ৫০০ টাকা দিলেন। ইয়াবা এসে গেল। ড্রাইভার ইয়াবা খেলো আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সে গাড়ি স্টার্ট দিলো।

ব্যবসায়ীর উপসংহার, এই ধ্বংসের জীবন থেকে ড্রাইভার আর কোনো দিন ফিরতে পারবে না।

লেখক

রেজোয়ান সিদ্দিকী