ইতিহাস ব্যক্তি ও খালেদা জিয়া

0
দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসাবে এবং দলের চেয়ারম্যান হিসাবে বিচারপতি সাত্তার তার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করে যাচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়া নানা বিষয়ে পরোক্ষাভাবে তাকে সহায়তা করছেন। এ অবস্থায় সেনা ছাউনিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কুচক্রি সেনা প্রধান এরশাদ দেখল বেশিদিন এভাবে চলতে থাকলে তার অভিলাষ চরিতার্থ করা যাবে না। এতদিন সুক্ষ্মভাবে দাবার গুটি চাল দিয়ে একটির পর একটি ঘটনা যে তিনি ঘটিয়েছেন, তার মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। তাই আর বিলম্ব নয়, ক্ষমতায় সেনবাহিনীর অংশীদারিত্ব চেয়ে তিনি একটি বিবৃতি দিলেন। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন বিতর্ক হলো। ইতোমধ্যেই পরিকল্পিতভাবে আইন শৃংখলাজনিত কিছু ঘটনা ঘটানো হলো। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এল। সেই কলঙ্কিত দিন। জেনারেল এরশাদ রাতের অন্ধকারে বঙ্গভবনে ঢুকে বন্দুকের নলের মুখে বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে কেড়ে নিল ক্ষমতা। বন্দুকের মুখে তাকে দিয়ে দেয়ানো হলো জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশন-রেডিওতে ভাষণ। বলানো হলো দুর্নীতি এতোই ব্যাপক হয়েছে যে, তার পক্ষে দেশ পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। বৃহত্তর স্বার্থেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ছিল নিতান্তই এরশাদের ভাওতাবাজি। সেদিন বার্ধক্যের পরিণতিতে বিচারপতি সাত্তারের পক্ষে কিছুই করার ছিল না।
তবে বিচারপতি সাত্তার এক বিবৃতির মাধ্যমে জাতীর সামনে তুলে ধরেন কিভাবে এরশাদ তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতা নেয়। বিবৃতিতে বিচারপতি সাত্তার বলেন, দেশের জনসাধারণের ভোটে আমি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমি দায়িত্ব পেয়েছিলাম। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গ্রগতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোতে এবং সুস্থ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যখন সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ত ছিলাম, সেই মৃহূর্তে রাতের অন্ধকারে আচমকা অস্ত্রের মুখে আমার কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এরশাদ। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনায় আমার সরকারের মাত্র চার মাস হয়েছিল, আজ স্পষ্টভাবে বলছি, অবৈধ সরকার ও তার তল্পিবাহকরা জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্যে এবং তাদের কুকীর্তি ঢাকা দেয়ার জন্য মিথ্যার পর মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। জাতির সামনে আমি যে রেডিও-টিভিতে ভাষণ দেয়েছিলম, সেটি আমার ছিল না। অস্ত্রের মুখে এরশাদ আমাকে দিয়ে বলিয়েছে, জাতি আজ মহা পরীক্ষায় অবতীর্ণ। একদিকে বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন, অন্যদিকে এরশাদের স্বৈরাচারী সমর্থনহীন অবৈধ সরকার স্থায়ী করার প্রচেষ্টা। আমি জনগণের কাছে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমি ও আমার সহকর্মীরা যখন দেশকে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করছিলাম, তখন কোন কারণ ছাড়াই গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এরশাদ শাহী ক্ষমতা হরণ করে। আমি এও বলতে চাই-নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সত্য-মিথ্যার বিচার করবেন”।
১৯৮২ সালের ১৬ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে খালেদা জিয়া স্বাক্ষরিত শত শত কার্ড বিতরণ করা হয়। এ বছরের ৩০ মে শহীদ জিয়ার প্রথম শাহাদৎ বার্ষিকীতে মাজারে শ্রদ্ধা নিবদনে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর প্রতি খালেদা জিয়া তাঁর তাৎক্ষণিক ভাষণে শোককে শক্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানান। শহীদ জিয়ার আদর্শের অনুসারী সকল নেতাকর্মীদের তিনি শপথ বাক্য পাঠ করান। এর পরপরই পুলিশ সমাবেশে লাঠিচার্জ করে এবং কতিপয় ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে। বিকেলে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাসভবনে অনুষ্ঠিতব্য মিলাদ মাহফিলে আসতে নেতাকর্মীদের বাধা দেয়া হয়। এদিকে বিভিন্ন সেনানিবাসে গ্যারিসন মসজিদগুলোতে কর্তৃপক্ষের আদেশ নিষেধের অপেক্ষা না করে সাধারণ সৈনিকরা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে।
১. একজন মানুষ আর্থসামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নতুনভাবে ইতিহাসকে নির্মাণ করতে পারেন। এখানে ব্যক্তি নির্ধারক শক্তি না হলেও ইতিহাসে তার প্রভাবকে কোনভাবেই খাটো করে দেখা যায় না। খালেদা জিয়া ঠিক একইভাবে ক্রান্তিকালের বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক প্রপঞ্চকে পরিণত হয়েছেন। সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি অন্যতম চালিকা শক্তির ভূমিকায় থেকেছেন। যেখানে জনগণের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণকে তিনি উৎসাহিত করেছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন আপন প্রত্যয়ে। এভাবেই ধীরে ধীরে ব্যক্তি মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রের ধারা ও গতি পরিবর্তনের ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তবে প্রশ্ন থেকে যায় খালেদা জিয়া কিভাবে পশ্চাৎপদ সামন্ত অবশেষ সমাজের এত বৃহৎ মাপের নেতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হলেন? এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন প্রখ্যাত রুশ চিন্তাবিদ জর্জ ভেলেন্টিনোভিচ প্লেখানভ। তাঁর ভাষায়- যারা ইচ্ছে শক্তির স্বধীনতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছেন; তারা তাদের সমসাময়িক অন্যান্যদেরকে তাদের নিজস্ব ইচ্ছে শক্তি দ্বারা উৎকর্ষতায় অতিক্রম করেছেন এবং যথাসম্ভব দাবি প্রদান করেছেন। ইতিহাসে এরা উৎকীর্ণ হন/এদের কোন ভাবেই ভূলে যাওয়া যায় না। ১৯৮১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হলে তাঁর দল বিএনপি এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অবস্থা আরো সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার যে কায়েমী স্বার্থপর লোকদ্বারা জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত পথ থেকে দ্রুতই সরে আসছেন এটি খালেদা জিয়া উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন খুব সহজেই। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালের প্রথম দিকে তিনি বিএনপির একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এবং পর্যায়ক্রমে দলের মূল জাতীয়তাবাদী ধারাকে নিজের নেতৃত্বের মধ্যে নিয়ে আসা তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শী চিন্তারই প্রতিফলন।
কিন্তু বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কখনেই বিপ্লবী বলা যায় না। কারণ এরা কখনই সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে নয়। তারপরেও তারা কর্মসূচীর ভিত্তিতে রাজনীতি করেন। এবং ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মানসিক অবয়বের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। সমাজের কোন বড় ধরনের কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য তাদের রাজনীতি পরিচালিত হয় না; অথচ তারা ক্যারিসমাটিক নেতৃত্বে পরিণত হন। এবং আত্মবিশ্বাস দ্বারা ওই নেতৃত্ব রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিত রচনা করেন। খালেদা জিয়া এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর কর্মকান্ডে যথার্থতা এনেছেন। জেনারেল এরশাদের আমলে স্বৈরশাসনের নিস্পেষণে জনগণকে প্রতিকুলতার মধ্যেও আন্দোলনে সক্রিয় ও উদ্যোগী করতে পেরেছেন। যেমন ১৯৮৬ সালে সামিরক শাসকের অধীনে নির্বাচন বর্জনের যে সিদ্ধান্ত তা খালেদা জিয়াকে তৎকালীন সময়ে সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠীকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আরো শক্তি যুগিয়েছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া সমাজ ও এদেশের মানুষের মনস্তত্বকে বিচার বিশ্লেষণ করে না আগালেও সামজের অভ্যন্তরীণ সমস্যার প্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে তিনি নাড়া দিতে পেরেছেন। পরবর্তী সময়ে এটি তাঁর পক্ষে জনমত সংগ্রহের বিষয়কে প্রচন্ড শক্তি যুগিয়েছে। এবং এরই সঙ্গে খালেদা জিয়া দেশনেত্রীর সম্মানে অভিসিক্ত হয়ে পরিপূর্ণ ক্যারিসমাটিক নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। এই ক্যারিসমাটিক নেতৃত্ব সম্পর্কে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ক্যাক্স ভেবার বলেছেন, এই আকর্ষণীয় ও অলৌকিক শক্তিশালী মানুষের শক্তির উৎস হলো আত্মসংযম, অনুগামীদের অন্যায়ের জন্য আত্মনিগ্রহ এবং অনুরাগীদের প্রশ্নাতীত ব্যাধ্যতা। এই উপাদানগুলোই হয়তো খালেদা জিয়াকে পর্যায়ক্রমে আপোষহীন ও আত্মপ্রত্যয়ী রাজনৈতিক নেতৃত্ব রূপে গড়ে তুলেছে।
এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের বেশ কিছু জাতীয় দৈনিকে সামরিক শাসনকে স্বাগতম জানিয়ে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল। এই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ এত দ্রুত পবির্তনশীল ছিল যে সাত্তার সরকারের অনেক মন্ত্রীবর্গ জেনারেল এরশাদকে সমর্থন করেন। কেউ কেউ মন্ত্রিপরিষদে পুনরায় সংশ্লিষ্ট হওয়ার জন্য আবেদন করেন। খালেদা জিয়া এই সময় সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন না। জিয়াউর রহমানের মৃত্যু শোকে মুহ্যমান এক গৃহিনীকে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট করানোর জন্য যেন একটি প্রেক্ষিত রচিত হচ্ছিল। ক্ষতাচ্যুত বিএনপির অভ্যন্তরে সীমাহীন স্বার্থ-সংঘাতে বিপন্ন দলকে নতুন মাত্রায় শক্তি যোগানোর জন্য ৮৩-ও ১ এপ্রিলে তিনি যে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন তা সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নতুন পটভূমি রচনা করেছিল। খালেদা জিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে শহীদ জিয়াউর রহমানে আদর্শ। এজন্য তিনি ১৯ দফা দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন উৎপাদনের রাজনীতি। আমি সেই জননেতার সহধর্মিনিী খালেদা জিয়া। শহীদ জিয়ার আদর্শ ও পথ নির্দেশনার সফল বাস্তবায়নই আমার জীবনের উদ্দেশ্য। আমি এদেশের সকল দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি; আসুন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ি, তাঁর বক্তব্যের প্রথম লাইনে ব্যক্তি জিয়ার প্রতি তাঁর ভালোবাসা শ্রদ্ধা প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু শেষ কটি লাইনে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ডাক, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামের আহ্বান প্রবলভাবে ফুঠে উঠেছে। দ্বিতীয় অংশে তাঁর দেশকেন্দ্রিক ও জনগণকেন্দ্রিক ভাবনা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শপথকে আরো নিশ্চিত করেছে। ফলে প্রথম অংশে ব্যক্তি জিয়ার প্রতি ভালোবাসা বাংলাদেশের প্রতি তাঁর প্রতিকী ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। জিয়াউর রহমান এখানে একজন ব্যক্তি নন; সমস্ত বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নের প্রতিকী সত্তা।
২.খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল সামরিক শাসন আন্দোলনের ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু করেছেন ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে। ৯০-এর অভ্যুত্থানে বিজয়ের মাধ্যমে একটি পর্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এই দশ বছরের স্বল্প বিস্তৃত রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার বিকাশ ঘটেছে বড় ক্যানভাসে। সামরিক জান্তা বিরোধী আন্দোলন দিয়ে শুরুটা হয়েছিল বলেই তিনি বাংলাদেশের জনগনের সাথে এতটা সম্পৃক্ত হতে পেরেছিলেন। জনগণের আকাঙ্খার সাথে তাঁর দল ও ব্যক্তি খালেদার একাত্মতা সারা বাংলাদেশের মানুষকে তাঁর প্রতি নির্ভরশীল করেছে। ধীরে ধীরে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অনিবার্য ব্যক্তিসত্তায় পরিণত হয়েছেন তিনি। সেটিই হচ্ছে তাঁর কৃতিত্ব, তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। জিয়াউর রহমানের বিএনপির চেয়ে খালেদা নেতৃত্বাধীন বিএনপির পার্থক্য এখানেই। কারণ খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে শেকড় পর্যন্ত বিস্তৃত জনগণের কাছে পৌঁছে গোছেন। এক্ষেত্রে বুর্জোয়া রাজনীতির কর্ণধার হিসেবে দেশগড়ার নতুন কোন তত্ত্ব বা কর্মসূচি তিনি দেননি। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তাঁর রাজনীতির উৎস শক্তি হলেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা নতুন আঙ্গিকে তাঁর দলকে পরিচালীত করেছে। এবং তাঁর জনপ্রিয়তাকে বৃদ্ধি করেছে। আর্থ- সামাজিক বাস্তবতা যখন কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত প্রকাশ করে তখন যেকোন ব্যক্তির সাহসী নেতৃত্ব প্রচলিত বিধি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এখানে একজন ব্যক্তির ভূমিকা সামান্য হলেও পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণের ক্ষমতা ও আন্দোলনের কর্মসূচি প্রদানের যথার্থতা তাঁকে ক্যারিসমাটিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। সুতরাং পরিস্থিতি অনুধাবনের প্রতিভা থাকা না থাকার ওপরই পরিবর্তনে ব্যক্তির ভুমিকা কি হবে তা নির্ভর করে। জনগণ এখানে মহা শক্তিশালী হলেও নেতৃত্বের যথার্থ পদক্ষেপ কম শক্তিধর নয়। খালেদা জিয়ার কৃতিত্ব এখানেই যে সীমাবদ্ধতা তাঁর ভেতর থাকলেও জনগণের আন্দোলনে চাহিদাকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রকৃত অর্থেই। ৮৬-তে তাঁর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত, এরশাদের পদত্যাগের দাবির ইস্যুর সাথে বিন্দুমাত্র আপোষ না করা বিষয়গুলো দ্রুতই তাঁকে সংগ্রামী ও আস্থাশীল নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেছে। জওহরলাল নেহেরু বলেছেন “ জনগণ হল মুখ্য কুশীলব। তাদের পেছনে থাকে, তাদের ঠেলে এগিয়ে দেয়ার মহা মহা ঐতিহাসিক তাগিদ। সেই ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং রাজনৈতিক আর সামাজিক তাগিদ না থাকলে কোন নেতা কিংবা আড়োলক তাদের ক্রিয়াকলাপে অনুপ্রাণিত করতে পারতো না খালেদা জিয়ার উত্থান তাঁর আপন প্রত্যয়ে, তাঁর আপন বিশ্বাসে। বুর্জোয়া রাজনীতির সহজাত প্রবণতা ও কৌশলকে তিনি কোন কোন ক্ষেত্রে অতিক্রম করেছেন। যেমন- এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল দলগুলোর প্রতি সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান। উৎপাদনের রাজনীতি ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগে ও তার ওপর গুরুত্ব আরোপ খালেদা জিয়াকে বিএনপির ভিত্তি মূল রাজনীতির বাইরেও আরো প্রসারিত করেছে। তাছাড়া বুর্জোয়া রাজনীতিতে আপোষকামিতা ও গোল টেবিলে বসে সমস্যার সমাধান বের করা বিষয়গুলোকে তিনি ঘৃণার সাথে পরিত্যাগ করেছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের দাবি দলের ভেতরে ও বাইরে সমান ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার আত্মবিশ্বাস তাঁকে দলের ভেতর আপোষকামীদের মধ্যে দারুণভাবে সমালোচিত করেছে। কিন্তু জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে অনেক উচ্চে আসীন করেছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, তাঁর নিহত স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে উৎসারিত নয়। তাঁর সমস্ত বিক্ষোভ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীর বিরুদ্ধে লৌহকঠিন আপোষহীনতায় প্রকাশিত হয়েছে। একারণেই দলের দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের চাপের মুখেও খালেদা জিয়া এরশাদ ঘেষিত তিনবার উপজেলা নির্বাচন, একবার গণভোট এবং পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার নির্বচনকে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের প্রধান অস্তিত্বশীল বিষয় যে নির্বাচন সেই নির্বাচনকে প্রত্যাখান করার মতো সাহস এ পর্যন্ত খুব কম নেতার মধ্যেই দেখা গেছে। দলের কায়েমী স্বার্থবাদীদের বৃত্তকে ভেঙ্গে একমাত্র জনগনের প্রতি নির্ভরশীলতা, জনগণকে নিয়ে সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে পরিচালিত করার প্রকৃত ইচ্ছে খালেদা জিয়ার ভেতরে বিদ্যমান। তিনি নিজেকে জনগণের আশা আকাঙ্খার অনুপ্রাণক শক্তিকে পরিণত করার জন্যই সবচেয়ে বেশি সজাগ ছিলেন। ১৯৮৯-এর মার্চে বিএনপির চতুর্থ কাউন্সিলে রাজনীতিতে কেন তিনি এসেছেন এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বজনপ্রীতি আর স্বার্থপরতার এক কলঙ্কিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অবৈধ এরশাদ সরকার… একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি আর বসে থাকতে পারি না। আপনাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি আপনাদের মিছিলে শরীক হই। কঠিন কোন তত্ত্বের কথা না বলে এদেশের প্রকৃতির মতো সহজ উপলব্ধিকে বক্তব্যে প্রকাশ করেই তিনি জনগণের সাথে মিশে গেছেন। সহজভাবে অনুভুতি প্রকাশের ক্ষমতা খালেদা জিয়াকে ক্রিয়াশীল সকল নেতা নেত্রীর চেয়েও প্রভাবশালী ও যথার্থ স্থলে প্রতিস্থাপন করেছে। সরল আবেদনের মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছের সাথে খালেদা জিয়ার একত্রিত হওয়ার আন্তরিক বিষয় তাঁকে জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য ও আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছে। খালেদা জিয়া হয়তো বিশাল বিশাল তত্ত্ব নিয়ে চর্চা করেননি। কিন্তু জনগণই যে তত্ত্ব সৃষ্টির উৎস এটি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। লেনিন জনগণ ও নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেছিলেন, জনগণ যেখানে সাগর তার মধ্যে আমরা তো মহাসমুদ্রে জলবিন্দু, জনগণ যে সম্বন্ধে সচেতন, তা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারলে একমাত্র তবেই আমরা এই বিশাল জনগণকে নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম হতে পারবো।” বিএনপির চতুর্থ কাউন্সিলে খালেদা জিয়া বক্তব্যে বলেছিলেন,”আপনাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমি আপনাদের মিছিলে শরীক হই”।এই অকৃত্রিম স্বীকার উক্তির মধ্যে উল্লেখিত বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য প্রতিফলিত।
৩. খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বুর্জোয়া রাজনৈতিক চর্চার ভেতরে। এই নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যেই তাঁকে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। দলের ভেতর তাঁর অসীম প্রভাব কখনো কখনো তাঁকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। তিনি শ্রেণীর তাঁর প্রতিনিধিত্ব করেছেন বেশ ভালোভাবেই। ফলে দেখা গেছে দীর্ঘ নয় বছরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর পেছনে যারা জড় হয়েছে তাদের প্রায় সকলেই স্বাধীনতাত্তোর ধনীক শ্রেণী। উৎপাদন বিচ্ছিন্ন পরজীবী ছাত্র সমাজ তাঁর নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছেন। তাঁর রাজনীতির প্রদর্শিত পথকে উত্তম ভেবে নিয়েছেন। অবশ্যই এরও একটি সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে। কারণ বাংলাদেশের জনগণের ভেতর যে সাহস, প্রতিবাদ করার মতো স্পর্ধা সেই উপাদান খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নির্দেশাবলীর ভেতর প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশে বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের ব্যর্থতা এদেশের তরুণ সমাজকে খালেদা জিয়ার মতো প্রতিবাদী এক অর্থে দু নেতৃত্বের দিকে আকৃষ্ট করেছে বেশি। বিএনপির রাজনীতির মধ্যে সমাজ বদলের ডাক নেই, অথচ অদ্ভূত বৈপরীত্যে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবাদী ছাত্ররা তাঁর দলের প্রসার ঘটিয়েছে। বিস্তৃত আঙ্গিকে আন্দোলনের প্রেক্ষিতকে আরো প্রবল করেছে। বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের ব্যর্থতাই এক্ষেত্রে খালদা জিয়ার সফলতার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই রাজনীতির নেত্রী হয়েও খালেদা জিয়ার ভেতর কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় তাহলো অধিকাংশ জগণের অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তা তিনি করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর পরিকল্পনা সমূহ স্পষ্ট না হলেও আন্তরিকতার কমতি নেই। একানব্বইর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর বক্তব্যে সেই জনকল্যাণমূলক চিন্তার জোরালো প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে তাঁর দল জনগণের আহার, শিক্ষা, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা ও পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করবে। চাকরির বয়স সীমা ৩০ বছরে উন্নীত করার উদ্যোগও তিনি গ্রহণ করবেন। সঠিক অর্থনেতিক পরিকল্পনা ছাড়া এগুলোর বাস্তবায়ন কঠিন হলেও তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন এটি তাঁকে প্রশংসিত করতে পারে। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন খালেদা জিয়া বিভিন্ন বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সীমাহীন দুর্নীতি ও আর্থিক সম্পদ লুণ্ঠনের কথা বলেছেন। তাঁর এই অভিযোগ সত্যি ছিল। কিন্তু প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে অবিকল রেখে দুর্নীতি যে দমন করা যায়- এ গভীর ভাবনায় তিনি প্রবেশ না করলেও দুর্নীতি মুক্ত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তাঁর ভেতরে প্রজ্জ্বলিত। খালেদা জিয়া যে রাজনীতি করেছেন, যে দাবির ভিত্তিতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছে তা একটি ব্যক্তির পরিবর্তনে ইস্যুকেই বেশি অর্থবহ করে তুলেছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত জেনালের এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির পরেও এ আন্দোলন সমাজের গভীরে বড় কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। খালেদা জিয়ার আপোষহীনতা তাঁর কর্ম ও চিন্তার প্রতিটি অবয়বে প্রবল ছিলে বলেই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পরেছে। একজন বাংলাদেশী মেয়ের প্রকৃতির মতো নরম মনের চিন্তা ধারাকে তিনি পাল্টে দিয়েছেন, যা ইতিহাসের নতুন দিক হিসেবে ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে। নারী মুক্তি ও স্বাধীনতা যে সমাজে নিষিদ্ধ প্রত্যয় তা তিনি ভেঙেছেন। পুরষকেন্দ্রীক সমাজের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে তিনি বৈপরীত্ব এনেছেন। বুর্জোয়া সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করা না হলেও খালেদা জিয়া সমাজে নারীর করণীয় সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নারীরা অন্য সবার মতো প্রতিভাবান এবং ক্ষমতার প্রয়োগকে তারাও সঠিক ভাবে নির্দেশ করতে পারে এ উপেক্ষিত বিষয়টি খালেদা জিয়া তাঁর দুরদর্শী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
৪. খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের বিপরীতে রাজনীতি করতে গিয়ে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছেন। ধর্ম এখানে অন্যান্য বুর্জোয়া দলের মতো উপজীব্য হয়েছে। তাঁর রাজীনতিক কর্মপন্থা জনগণের কাছে ভালো লেগেছে। এটি এখন প্রমাণিত সত্য। জিয়াউর রহমান রাজনীতি করেছেন ওপর থেকে। অন্যদিকে খালেদা জিয়া তাঁর বিপরীতে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে ব্যাপক জনগণকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন। তাঁর রাজনীতির সঙ্গে জনগণের উপস্থিতি রয়েছে বলেই জিয়াউর রহমানের চেয়ে তাঁর দলের ভিত্তি আরো শক্তিশালী। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তাও জিয়াউর রহমানের ইতিহাসের নির্দিষ্ট অবস্থানকে কোন কোন ক্ষেত্রে অতিক্রম করেছে। উত্তরাধিকারের রাজনীতির পথ ধরে তিনিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। প্রথম দিকে শহীদ জিয়ার আদর্শ ও দেশের উন্নয়নের জন্য ১৯ দফা বাস্তবায়নের প্রস্তাব নিয়ে তার রাজনীতিতে আগমন। এখন সময় বদলেছে। ফলে ভিন্ন আঙ্গিকে রাজনীতির কথা তাঁকে ভাবতে হচ্ছে। যা আরো বিস্তৃত পরিধিতে জনগণকে তাঁর রাজনীতিতে সক্রিয় করবে। জনগণকে রাজনৈতিক বাণিজ্যের ও পণ্য করার অপকৌশল থেকে তিনি মুক্ত করেছেন। জনগণকে ভালোবাসা ও প্রকাশ্য কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে নেতৃত্বের আপোষহীন ধারায় দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন বলেই জনগণের গভীরে তিনি যেতে পেরেছেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ব্যক্তি খালেদা জিয়া জনগণের ইচ্ছের প্রতিকি শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। জনগণ ইতিহাসকে নির্মাণ করে। ব্যক্তি নেতৃত্ব তাঁর পথ দেখায়। খালেদা জিয়া স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জনগণের সেই বিশ্বস্ত নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। এ কারণেই খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বের প্রখরতা তীব্র, সর্বগ্রাসী।
লেখক
সেলিম ওমরাহ খান
সাংবাদিক, কলামিস্ট