ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা,ভোট ডাকাতি আর সন্ত্রাসে নতুন রেকর্ড

0

জিসাফো ডেস্কঃ দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে তৃণমূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ছয় ধাপের মধ্যে চার ধাপের ভোট ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চার ধাপের ফলাফল এবং বাকি দুই ধাপের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা ইসিতে পৌঁছেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যে সহিংসতা হয়েছে আর ছয় ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের যে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তা অতীতের যেকোনো সময়ের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং আহতদের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায় থেকে ইসিতে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এবার ইউপি ভোটে ৪ হাজার ১২২ ইউপির মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ২১২ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের সময় যে ইউপি ভোটকে অস্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়েছিল তখন ১০০ জন চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২১২ চেয়ারম্যানদের মধ্যে প্রথম ধাপে ৭১২টি ইউপিতে ৫৪ জন, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩৯টিতে ৩৪ জন, তৃতীয় ধাপে ৬১৫টিতে ২৯ জন, চতুর্থ ধাপে ৭০৩টিতে ৩৫ জন, পঞ্চম ধাপে ৭২৯টিতে ৪২ জন ও সর্বশেষ ষষ্ঠ ধাপে ৭২৪ ইউপিতে ১৮ জন বিনা ভোটে জয়ের তথ্য এসেছে ইসিতে। যদিও ইসির পক্ষ থেকে ষষ্ঠ ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্যা ঠিক আছে কি না, তা পুনরায় নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

ষষ্ঠ ধাপে বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাটের গাংনী, চট্রগ্রামের বাঁশখালীর সরল, চাঁদপুরের মতলব উত্তরের কলাকান্দা ও গজরা, রাঙ্গামাটির কাউখালীর ফটিকছড়ি, টাঙ্গাইলের কালিহাতির দশকিয়া, ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া, নরসিংদীর পলাশের চরসিন্দুর ও জিনারদা, মাদারীপুরের শিবচরের ভদ্রাসন, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের চরকুমারিয়া ও রামভদ্রপুর, পিরোজপুরের পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা, ভোলার চর ফ্যাশনের চর কুকরি-মুকরি, ভোলার দৌলতখানের ভবানীপুর, পাবনা সদরের গয়েশপুর, বগুড়া সদরের ফাঁপোর ও শাজাহানপুরের আশেকপুর ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

ইসি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালের ইউপি ভোটে মাত্র চারজন, ১৯৯৭ সালে ৩৭ জন, ২০০৩ সালে ৩৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার তথ্য নেই ইসিতে।

এছাড়া ইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ জন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ২৩৪ পৌরসভার নির্বাচনে ১৪০ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এদের মধ্যে ছয়জন মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ৯৪ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর ৪০ জন ছিলেন।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও বেশ কয়েকজন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া চলমান ইউপি ভোটে প্রথম ধাপে ১১৯, দ্বিতীয় ধাপে ৭৯, তৃতীয় ধাপে ৮১, চতুর্থ ধাপে ১০৬ ও পঞ্চম ধাপে ১০০ ইউপিসহ পাঁচ শতাধিক ইউপিতে প্রার্থী দেয়নি বিএনপি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে আইনে কোনো বাধা নেই। তবে যদি কোথাও অনিয়ম বা কাউকে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়। এবং আমাদের কাছে অভিযোগ করেন তাহলে আমরা সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।

তিনি বলেন, প্রার্থীদের সুবিধার জন্য আমরা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ছাড়াও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাই কমিশন করেছে।

নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ইউপি ভোটে সহিংসতা সব সময়ই হয়। আগে মিডিয়া অনেক কম ছিল। তাই সব খবর পাওয়া যায়নি। এখন মিডিয়ার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কোনো ঘটনা ঘটনার সাথে সাথে তা চলে আসছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, বিনা ভোটে বিজয়ী হওয়ার যে ধারা তৈরি হলো তাতে ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে।

ইসি সূত্র আরও জানায়, বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা দেখা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিকভাবে এ নির্বাচন হওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন কয়েকজন নির্বাচন কর্মকর্তা। তাদের মতে, দলীয় প্রভাব খাটিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিনা ভোটে প্রার্থীরা জয়ী হচ্ছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আমল মজুমদার বলেন, বিনাভোটে নির্বাচন হওয়ার যে প্রচলন শুরু হলো তা নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। এটা দলীয়ভাবে প্রথম নির্বাচন তাই কমিশনের আরও সচেতন হওয়া দরকার ছিল। কারণ সরকার দলীয় প্রার্থীরাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে অন্যকোনো দল। ক্ষমতায় এলে সে দলের প্রার্থীরাও একই কায়দায় জয়ী হতে চাইবেন। যা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর হবে না।

আগের চার ধাপের ফল : আ. লীগ ১৮২২, বিএনপি ২৩৭

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, প্রথম ধাপে ৭৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৭৮ শতাংশ, তৃতীয় ধাপে ৭৬ শতাংশ ও চতুর্থ ধাপে ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। প্রথম ধাপের ৭১২টি ইউপির মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৫৪ জনসহ আওয়ামী লীগ ৫৪০, বিএনপি ৪৭ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ১০৯ ইউপিতে।

দ্বিতীয় ধাপের ৬৩৯ ইউপিতে ভোট হয়। এর মধ্যে ১০টিতে পুনঃভোট করতে হবে। বাকি ৬২৯টি ইউপিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ ৪৪৭টি, বিএনপি ৬১টি, ১১৫ আসনে স্বতন্ত্র ও বাকি ছয়টি আসনে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এ ধাপে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হয়েছেন।

তৃতীয় ধাপে ৬১৫ ইউপিতে ভোট হলেও ভোটকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পাঁচটি ইউপিতে পুনঃভোটগ্রহণ করতে হবে। ৬১০ ইউপি’র ফলাফলে আওয়ামী লীগের ৩৯৫ জন, বিএনপি’র ৬০ জন, ১৩৯ ইউপিতে স্বতন্ত্র ও ৬টি ইউপিতে অন্যদলের প্রার্থীরা জিতেছেন। এ ধাপে আওয়ামী লীগের ২৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হয়েছেন।

চতুর্থ ধাপে ৭ মে অনুষ্ঠিত ৭০৩ ইউপির ভোটে চেয়ারম্যান পদের ৬৪৯টি ইউপির চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ৩৫ ইউপিতে ব্যালটে ভোট হয়নি। অনিয়মে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ২০টি ইউপির বাতিল হওয়া কেন্দ্রে পুনঃভোট করতে হবে।

মাঠপর্যায় থেকে ইসিতে পাঠানো ৬৪৯ ইউপির ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ৪০৫ জন, বিএনপি’র ৭০ জন, জাতীয় পার্টির ১০ জন ও ১৬১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

১১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া ইউপি ভোট পঞ্চম ধাপে ২৮ মে ৭২৯ ও ষষ্ঠ ধাপে ৪ জুন ৭২৪ ইউপির ভোটের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের ইউপি নির্বাচন।