ইউপি নির্বাচনে পিতার সামনে পুত্রকে গুলি করে হত্যা

0

জিসাফো ডেস্কঃ ‘আমার সামনেই আমার বাবারে গুলি করে মারলো। আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আর বাঁচতে চাই না। আমিও মরে যাবো।’ একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই গগনবিদারী আর্তনাদ করছিলেন কেরানীগঞ্জের হজরতপুর ইউপির ঢালিকান্দি গ্রামের হালিম কাজী। পাশেই শীতল পাটিতে উদোম গায়ে শুইয়ে রাখা ছিল শিশু শাহিদুল ইসলাম শুভর (৯) নিথর দেহ। কচি শিশুটির নিষ্পাপ চেহারায় হাসি তখনও অমলিন ছিল। একমাত্র ছেলের লাশের পাশে বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা সুবর্ণা বেগম। তার মাথায় অনবরত পানি ঢেলে সুস্থ করার চেষ্টা করছিলেন প্রতিবেশীরা।

এর পাশেই মাটিতে গড়াগড়ি করছিলেন চাচা সলিল কাজী। তার চিৎকারে ওই বাড়ির পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছিল। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত অনেকেই। পুরো বাড়িতেই চলছিল শোকের মাতম। নিঃসন্তান সলিল কাজী বলেন, শুভ আমাকে ‘বড় বাবা’ বলে ডাকতো। ওরা আমার বাবারে এভাবে মেরে ফেললো। এখনও কে আমাকে বাবা বলে ডাকবে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি জানান, ভাই- আমি সৌদি আরবে থাকি। তিন মাস আগে দেশে এসেছিলাম। আমরা তো রাজনীতি করি না। এই ভোটের জন্য আমার বাবাকে কেন ওরা মারলো? শুভর বাড়ি থেকে মিনিট দুয়েকের পথ মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। ভোটের উৎসব দেখতে মায়ের সঙ্গে হেঁটে ওই কেন্দ্রে এসেছিল শুভ। বাবার কাছে দাঁড়িয়ে ভোটের দৃশ্য দেখছিল।কিন্তু সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ ওই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আয়নালের সমর্থক রানা মোল্লার নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন অস্ত্রধারী ক্যাডার অতর্কিত গুলি ছুড়ে। এতে শাহিদুল ইসলাম শুভসহ আরও ৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। ৯ বছরের ছোট্ট শুভর পেটে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় দ্রুত তাকে স্থানীয় হজরতপুর মডার্ন হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা জানান, প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হওয়ায় পথেই তার মৃত্যু হয়েছে। শুভ মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। নিরপরাধ ওই শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ওই কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শোকের ছায়া নেমে আসে ঢালিকান্দি গ্রামে।

ঢালিকান্দি গ্রামের যুবক মাহিদুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর ৪০ বছর ধরে একটানা হজরতপুর ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন নুরুল হক রিপনের পিতা। কিন্তু কোন নির্বাচনেই এমন গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। যারা গুলি চালিয়েছে তারা কেউ এই গ্রামের নয়। সবাই বহিরাগত ক্যাডার। তিনি আরও বলেন, মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নুরুল হক রিপনের বাসভবনের লাগোয়া। আর এই কেন্দ্রে প্রায় আড়াই হাজার ভোটার। তাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর একটা ভয় ছিল। সকাল ৮টা বাজতেই শ’ শ’ নারী ও পুরুষ ভোটার কেন্দ্রে এসে লাইনে দাঁড়ায়। প্রথম এক ঘণ্টা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর অর্ধ শতাধিক বহিরাগত ক্যাডার কেন্দ্রের আশপাশে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশের বাধা পেয়ে ওই ক্যাডাররা অতর্কিতে গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলির শব্দ শুনে পুলিশ ভোটকেন্দ্রের ভেতরে চলে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ওই ভোটকেন্দ্রে। উপস্থিত আতঙ্কিত ভোটাররা কেন্দ্র থেকে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে।

তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ। তাদের গুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হলে একপর্যায়ে স্থানীয় এলাকাবাসী জড়ো হয়ে ক্যাডারদের ধাওয়া দেয়। এতে তারা পালিয়ে যায়। এর আধা ঘণ্টার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ শতাধিক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে প্রিসাইডিং অফিসার মাইকে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। ফের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী এসআই তন্ময় মানবজমিনকে বলেন, প্রথমে বহিরাগত ক্যাডাররা ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাদের বাধা দিয়েছি। তাদের এই তৎপরতা দেখে আগেই আমার পিস্তলে গুলি লোড করেছিলাম। এরপর প্রিসাইডিং অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমাকে গুলি ছোড়ার অনুমতি দেননি। পুলিশের এর চেয়ে বেশি কিছু করার ছিল না।

ঘটনার সময় ওই কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক রিপন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ক্যাডাররা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশে গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু আমি দৌঁড়ে পালিয়ে প্রাণে বেঁচেছি। ভোটকেন্দ্র দখল ও জালভোট হামলার অভিযোগ এনে বেলা সাড়ে ১২টায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি। তবে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আয়নাল মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে নিহত শুভর ময়নাতদন্তের বাদ আসর তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।