“আমারে দেব না ভুলিতে” -শওকত মাহমুদ

0

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা সত্তার স্মরণে আজ আমরা এখানে সমবেত। তিনি শহীদ জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তাঁর সৃষ্টিশীল-নেতৃত্ব, দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করার পদক্ষেপ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে একযোগে তাঁর সমসাময়িক কালের উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করে।

শহীদ জিয়ার জীবনাবসান ৩০ মে ১৯৮১তে। দেহে মনে যেমন সুস্থ, সজীব, দেশপ্রাণ ও চিরায়ত স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, তাতে তাঁর শতায়ুই চেয়েছিল তৃতীয় বিশ্বের মজলুম মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির বেড়ে ওঠা এবং গরীব দুনিয়ার স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জিয়ার আয়ু সম্পর্কিত হয়ে ওঠায় তাঁকে চক্রান্তের শিকার হতে হয়। আমাদের জন্য কী রেখে গেছেন, সে হিসাব অসম্ভব কাজ, জীবন স্মৃতির আয়নায় পুরোটা আসে না। একাশির জুনে মানিক মিয়া এভিনিউতে অযুত-লক্ষ মানুষ যেদিন সমবেত হয়েছিল, আমার মনে হয়েছিল সবাই যেন কাফনের কাপড়ে। আমি কাউকে দেখিনি, শুধু দেখেছি সেই বজ্র কঠিন অমর দেশনায়ক জিয়া সৌম্য মূর্তিতে দীপ্যমান, একটি কন্ঠ ভাসছে “আমারে দেব না ভুলিতে।”

মনের দেউড়িতে বসে শহীদ জিয়াকে বারবার স্মরণ করার, পিছু হটে যাওয়া সেই সময়ের চেহারা দেখবার লোভ ভেতরবাগে সব সময় বয়ে চলে। সময়ের ওই আদলটাকে মুঠো ভরে ধরতে কী শান্তি! কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে – “জানালাটা খুলে দাও, আলোরা বসুক বিছানায়। আলোরা শুনিয়ে যাক ভুলে যাওয়া আরব্য রজনী। কত কি যে ভুলে গেছি, ভুলে গেছি এবাদুর গীতি ও নীল ভোরের আলো, আজ একটু আজান শোনাও।”

শাহাদাত বার্ষিকীতে এই যে কথাগুলো বললাম, এরই একত্র সন্নিবেশের মধ্য দিয়ে জীবনকালে জিয়াউর রহমান একজন সামরিক অধিকর্তার সত্তা থেকে নিজের উত্তরণ ঘটান একজন রাষ্ট্র নেতায়। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র-রাজনীতির অঙ্গনে তাঁর পদচারণার আগের সময়টি ছিল সর্ব অর্থে অন্ধকার। তাঁকে নিজের সময়টিকে পূর্ব সময় থেকে পৃথক করতে হয়েছে। এই কাজটি তিনি করেছেন দেশবাসীর দৃষ্টির সম্মুখে থেকে। দেশবাসী সময়ের এবং ব্যক্তির, গত জমানার এবং নতুন নেতৃত্বের পরিচালনায় রাষ্ট্রের আলাদা বৈশিষ্ট্য সহজে অনুধাবন করতে পেরেছে। সংক্ষেপে বলি ঃ ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-স্কুল অঙ্গণের বিগত সময় এবং নতুন সময়ের পার্থক্য নির্মাণ, রাজনীতি-নিরপেক্ষতার চারিত্র্য নির্মাণ, কৃষিকে গতিশীলতা উৎপাদনশীলতায় জাগিয়ে তোলা এবং এতে ব্যাংক ঋণ সংশ্লিষ্টতার মধ্য দিয়ে কৃষি পুঁজির বিকাশ সাধন, শিল্প খাতকে উদ্যমশীল করে একে বহুধা বিকশিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ, গার্মেন্টস নামে সম্পূর্ণ নতুন খাতের সংযোজন ঘটিয়ে শিল্প পুঁজির বিকাশে চেষ্টা, দেশের কৃষি ও পল্লী খাতের বিপুল অলস-অদক্ষ জনশ্রেণীর জন্য বিদেশের শ্রম বাজারের সন্ধান দান, তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান, সমুদ্র উপকূলের জমিতে লোনা পানির চিংড়ি চাষ – এই সবকিছুতেই শহীদ জিয়া পথ দেখান একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শুধু নয়, একজন অগ্রণী দেশকর্মি হিসেবেও। স্বাধীন দেশ, তার বর্ধিত লোকসংখ্যা, বর্ধিত চাহিদা ইত্যাদি হিসেবে নিয়েই জিয়া নতুন নতুন পথ উন্মোচনে সচেষ্ট হন। পাশ্চাত্যের আরোপিত কলংক অভিধা ‘বটমলেস বাস্কেট বা তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে দেশকে স্বনির্ভরতায় বিকশিত করতে হবে- এই চেতনাও তিনি ছড়িয়ে দেন দেশবাসীর মাঝে। চাকরি ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য সুযোগের দুয়ার উন্মুক্ত করা, সংস্কার ভেঙ্গে ফেলতে পুলিশে-আনসারে মেয়েদের চাকরি দেয়া- এসব কাজ শুরু হয় শহীদ জিয়ার সময়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তাঁর নিজস্ব সত্তায় জাগিয়ে তুলে পথ চলার চেতনা নির্মাণে শহীদ জিয়া বলেছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। প্লুরালিষ্টিক বা বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি অখণ্ড নিবেদনের প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি। সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মতের প্রতি ছিলেন সহনশীল। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নামক আজকের লাগসই চলতি শব্দটি ব্যবহার না করে বলব, বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্যে, এর কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাসেরও প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি।

জৈববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি মিলেই মানুষ। শরীরে টেকা আর বাড়া আর তার ভোগের জন্য ব্যবস্থা করা। সবাইকে দাবড়ে, কেড়ে খেয়ে, একলা ফেঁপে ওঠার নেশা। বিপরীত সত্যটি হচ্ছে মানুষ মনোময়। মন বলতে কেবল হৃদয়বৃত্তি নয়, তার সঙ্গে জুড়ে আছে তার বুদ্ধি এবং মর্যাদাবোধের চেতনা। রাজনীতিও তাই, ভোগের এবং ত্যাগের। জিয়াউর রহমান জাতির যখন বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছেন, ভোগ শব্দটিকে তার ব্যক্তিগত অভিধান থেকে তুলে দিয়েছিলেন বলে তার সময়টা নিয়ে ভাবতে বুকে কী অসীম গৌরব জাগে বলে শেষ করা যাবে না। সেজন্যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক থেকে বাংলাদেশের সফল নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক হতে পেরেছিলেন। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিকের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন A Statesman is a politician who places himself at the service of the nation. A Politician is a statesman who places nation at his service.

অর্থাৎ একজন রাষ্ট্রনায়ক হচ্ছেন রাজনীতিবিদ যিনি নিজেকে জাতির সেবায় উৎসর্গ করেন আর একজন রাজনীতিক রাষ্ট্রনায়ক হতে গিয়ে জাতিকে তার সেবায় নিযুক্ত করেন।

বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের যে অহমবোধ তাকে বাঁচাতে বিদেশীদের বিরুদ্ধে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ, ১৮৫৭ তে বাঙালি মুসলমান সৈন্য অধ্যুষিত বেঙ্গল ল্যান্সার্স ইউনিটের সিপাহী বিদ্রোহ, ’৬৫র খেমকারানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বীরত্বপূর্ণ লড়াই এবং ’৭১এ চুড়ান্ত স্বাধীনতার মরণপণ সংগ্রাম- এ সবের নানা ওঠা-পড়া, নানা এগোনো-পিছানোর মাঝ দিয়ে উতরে আসার ধারাপাতই আমাদের ইতিহাস। আর তাঁর মধ্যমণি শহীদ জিয়া। ’৭১ এর অনিশ্চিত-অনির্দেশ্য সময়ে দেশবাসীর কানে বেজেছিল তাঁর কণ্ঠস্বর, স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে- আমি মেজর জিয়া বলছি। আর কেউ তা পারেনি বলে তিনি সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের ছাড়িয়ে গেছেন অনেক উচ্চতায়। পরম শ্রদ্ধেয় আমাদের জাতীয় কবি নজরুল যেন এমন এক চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর সেই আকুতি “অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ। কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।

কিন্তু কাণ্ডারী জিয়া কি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই নিঃশেষ হয়ে গেলেন? না! তারপর পাঁচ, সাড়ে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ঘটনার আবর্তে আবার এলেন তিনি। এবং এসে তিনি শুরু করেন এক আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণ কাজ। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিজের ব্যক্তিচিন্তা ও কর্মের প্রভাব সঞ্চারে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। বর্জনবাদী, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মানসিকতাসম্পন্ন স্বৈরতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর ছিল না। বরং তাঁর রাজনৈতিক কর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রহণবাদী, একমোডেটিভ মানসিকতা ছিল তাঁর। এর ফলে অতি বাম, অতি ডান গোষ্ঠীর সকলে তাঁর দলে এসে ঠাঁই পেয়েছে এবং নতুন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে। তাঁর সেই কাজের প্রভাব আজো সমাজে দৃশ্যমান। তাঁর জীবনকালে যারা অনেকে বিরুদ্ধবাদী ছিল, পরে তারা বিএনপিতে এসেছে এবং শহীদ জিয়াকে তাদের নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে। বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মি বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রে একথা সত্য। এখানেই শহীদ জিয়ার প্রভাবের চিত্রটা উপলব্ধি করা যায়।

স্মরণ করলে দেখা যাবে, অস্ত্র আর গুলির মুহুর্মুহু নিনাদের মধ্যে নেতা হিসাবে এসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের কাণ্ডারী হয়ে রাষ্ট্রকে দ্রুত এক সুস্থির কাঠামোতে দাঁড় করালেন। একদলীয় শাসনের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বদলে মিশ্র অর্থনীতি, একদলীয় শাসনের বিপরীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র উপহার দিলেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডাকে মূলমন্ত্র রেখে গঠিত হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এরপরের ইতিহাস হচ্ছে এক সচেতন কাণ্ডারীর হাতে বাংলাদেশের একটি সংবিধান সম্মত আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের নিয়ামক হচ্ছে দেশের জনতা এবং নেতা হিসাবে নির্মাতা হচ্ছেন জিয়া। ১৯৬৫ থেকে ধরলে আজ অবধি পাঁচটি দশক জিয়াউর রহমান এই নামটি ক্রমে জনমানুষের চিন্তা চেতনায় আলোড়িত হয়ে চলেছে।

জিয়া যে চিরায়ত স্বাধীনতা সংগ্রামী, তার ব্যাখ্যায় বলব বাংলাদেশের রাষ্ট্র নেতা হিসাবে তাঁকে শুধু প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি হিসাবে দেখা যাবে না। সমাজ জীবন যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা যখন বেড়াজালে আবদ্ধ, আর্থিক জীবন বিধ্বস্ত, শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত. লোকসমাজের মনোজগৎ এবং চেতনা ও মনন লক্ষ্যভ্রষ্ট, সর্বোপরি রাজনৈতিক জীবন বিপন্ন তখন জিয়া আসেন রাষ্ট্রে রাজনীতির মধ্যমঞ্চে। ১৯৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত ছিল নাৎসীবাদের শ্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসীবাদের ইতিহাস। এক নেতা এক দেশ- এই শ্লোগানটি ছিল হিটলারের নাৎসী দলের। ভারতের সু-সাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়ের একটি মন্তব্য উল্লেখ না করে পারছি না । তিনি (১৯৯৬) বলেছিলেন, “ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীবাদ দুটোই এখন পরাজিত। কিন্তু কতক লোক এখনও ফ্যাসিজমের অনুরক্ত। তারা তা ফিরিয়ে আনতে চায় বা প্রবর্তন করতে চায়। ফ্যাসিজম হচ্ছে এমন এক মতবাদ, যার রাজনৈতিক দিকটা ছিল সংবিধান লঙ্ঘন, পার্লামেন্টারি নির্বাচন বন্ধ, নাগরিকদের ভোট অধিকার হরণ, একটি দল ছাড়া অন্য সব দল নিষিদ্ধকরণ। বক্তা ও লেখকদের বাক স্বাধীনতা বিলোপ। সরকারের পক্ষ থেকে মিথ্যাচার।”

জিয়াউর রহমান এদেশের কোটি কোটি কৃষক শ্রমিক যুব-ছাত্র-তরুণ ও নারীকে তাদের আত্মশক্তিতে, আদ্যশক্তিতে জাগিয়ে জাতিকে এক নিদারুণ ভগ্নদশা ও দুরবস্থা থেকে সচল গতিশীল অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার নির্মাণ কাজে নেতৃত্ব দেন। এখানে তিনি নিজেকে অর্থাৎ ব্যক্তি জিয়াকে তুলে ধরার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাবলীকে সুস্থির অবস্থানে দাঁড় করানোর কাজে হাত দেন। শ্লোগান তুললেন -ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ। বহুদলীয় গণতন্ত্রের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে সংবাদপত্র, বাক ব্যক্তির স্বাধীনতা দেন। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে তাঁর নিখাদ সততায় তিনি পরিণত করেছিলেন সত্যিকার এক মাহাত্ম্যে যা, ছিল কেবল স্বার্থশূন্য দেশসেবা ব্রত। চিরায়ত স্বাধীনতা সংগ্রামী জিয়া আমাদের এই দেশকে এক অর্থে স্বাবলম্বী, পরনির্ভরতাবর্জিত, পরাশ্রয়বিহীন শ্বাশ্বত স্বাধীন সমৃদ্ধ দেশ রূপান্তরের চেষ্টা করে গেছেন। দেশের অন্তকাঠামোতে নানা নির্মাণ কাজ, বহির্দেশীয় ক্ষেত্রে সার্কসহ আন্তঃরাষ্ট্র সহযোগিতার নানা কাঠামো তৈরি – এমন বহু নির্মাণ কাহিনী বলা যাবে না তার আলোচনায়। সবচেয়ে বড় কথা, জাতীয়তাবাদের দিশারী হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শৈশবকে যৌবনের মাহাত্ম্যে উদ্ভাসিত করেছিলেন।

শহীদ জিয়ার বিচরণ খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র-ভাবনা, দল-চিন্তা, গণতন্ত্রবোধ সমাজ ও রাষ্ট্রজুড়ে রেখে গেছে এক স্থায়ী প্রভাব। আমরা এখনও এই মুগ্ধতায় অন্তরীন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার আদর্শের অভিভাবকত্বের নাগাল থেকে বেরোলেই বাংলাদেশ লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। শহীদ জিয়ার আদর্শকে দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের সঙ্গে বহন করে চলেছেন আরেক যুগান্তকারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। উপমহাদেশের ইতিহাসে আর কোন রাজনীতিক দেখিনি, যিনি ২৮ বছর ধরে একটি দেশের মানুষের কাছে সবচাইতে জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে আছেন এবং যতো আসনে ভোটে দাঁড়ান, অবলীলায় নির্বাচিত হয়ে চলেছেন।

বিএনপি’র নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেওয়ার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে একজন নাগরিক হিসেবে বলব বিএনপি’র যারা জিয়ার ত্যাগের রাজনীতি ছেড়ে ভোগের রাজনীতিতে যখনই মেতেছেন, তারা বিএনপি এবং দেশের জন্য অকল্যাণ ডেকে এনেছেন।

আমার ভাষণ শেষ করতে চাই, আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শহীদ জিয়ার আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা বলে। এক সময় বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। তখন সীমান্তের ওপারে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে পানির প্রতি আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। এখন আবার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেই বাহাত্তরের সংবিধান ফিরিয়ে আনার এবং বিসমিল্লার উচ্চারণ থেকে মানুষকে বারণ করার। একই সঙ্গে সীমান্তের ওপারে টিপাইমুখ বাঁধ চালু করে বাংলাদেশকে জীর্ণ করার চক্রান্ত চলছে। শহীদ জিয়া বাংলাদেশকে জাতি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে গেছেন। আজ তাকে বাজার রাষ্ট্রে, অভিভাবকহীবন রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। চলছে বিএনপি ও তার চেয়ারপার্সন বেগম জিয়াকে বাস্তচ্যুত করার অপচেষ্টা। দেশের ভেতরে ও বাইরের এই ষড়যন্ত্রকে রুখতে জাতীয়তাবাদী ঐক্য এবং ত্যাগের সংগ্রাম প্রয়োজন।

শহীদ জিয়াকে স্মরণের সার্থকতা কোথায়, তা ঠিক করতে হবে আমাদের। আমরা যারা এখন কথা বলছি, শুনছি, শ্লোগান তুলছি- সকলকে এই সার্থকতার দিকটা নিয়ে ভাবতে হবে। আমি বলব, জিয়ার জীবন-চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা যদি আমাদের মধ্যে ধারণ এবং বিকশিত করতে পারি তবেই পাব স্মরণের সার্থকতা। বিএনপি নেতাকর্মিদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলব, আসুন, আমরা সেই পথ অনুসরণ করি।

আজ বর্তমান রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে শহীদ জিয়ার চরিত্র-বৈশিষ্ট্যে নিজেদের কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, সহনশীলতা, জনজীবনকে আত্মবিশ্বাসে মণ্ডিত করা – এর সবকিছু ২০০৭ এবং ’৮ এর ছ্দ্ম সামরিক শাসন ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যার প্রকাশ্য মদতে ছিল আজকের এই মহাজোট সরকার। নইলে আজ হঠাৎ কেন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে শুনতে হবে টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়? কেন আমাদের শুনতে হবে, আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই? হুদা-ছহুলদের নির্বাচন কমিশন ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ঘোষণা করেছে একটি একদলীয় পার্লামেন্ট। যতই বিশ্ব মন্দার ঢাক পেটানো হোক না কেন, দেশে বিনিয়োগ প্রবাহ বন্ধ। ফসলের দাম নেই। কৃষক দিশেহারা। ভোক্তার নেই ক্রয় ক্ষমতা। মূল্যবৃদ্ধির দাপটে মধ্যবিত্ত অস্থির অসহায়। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। সেনাবাহিনীর অর্ধ শতাধিক অফিসার খুন করে তার মনোবল ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে, বিডিআর অস্তিত্বহীন। স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামো প্রায় ধ্বংস। তাই নাগরিক হিসেবে নিজের মধ্যে এক ভীতি অনুভব করি। এ সময় আমরা সকলে একযোগে বলি না কেন, শহীদ জিয়া জিন্দাবাদ; সারা বাংলার ধানের শীষে জিয়া তুমি আছো মিশে।

শহীদ জিয়ার চেতনা, শহীদ জিয়ার অবস্থান আমাদের সকলকে এমন আদ্যাশক্তিতে জাগিয়ে তুলুক যে, আমরা বলতে পারি, আমরা সকলে আধুনিক, অগ্রসর, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নাগরিক।

স্বাগতঃ বঙ্গে মুক্তিকাম। সুপ্তবঙ্গে জাগুক আবার লুপ্ত স্বাধীন সপ্তগ্রাম- এই আহবান জানিয়ে কবি নজরুল বলেছিলেন, তোমরা বন্ধু, কেহ অগ্রজ, অনুজ সোদর সম। প্রার্থনা করি ভাঙ্গিয়া দিও না মিলনের সেতু মম। এই সেতু আমি বাঁধিব, আমার সারাজীবনের সাধ। বন্ধুরা এস, ভেঙ্গে দিব যত বিদেশীর বাধা বাঁধ (বন্ধুরা ফিরে এসো)। আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক অমর দেশনায়ক শহীদ জিয়ার স্মৃতির প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তব্য শেষ করছি।