আমরা শিক্ষকদের লাশের ভার নিতে গিয়েই দেখছি শিক্ষা ও জ্ঞানহীন রাষ্ট্রের দেহ কতোটা কঙ্কালসার

0

জিসাফো ডেস্কঃ ইচ্ছে করলে ঘটনার দিনেই লিখে ফেলতে পারতাম। লিখিনি ইচ্ছে করেই। দেখতে চেয়েছিলাম ফুলবাড়িয়ার কলেজ শিক্ষক আবুল কালাম নিহতের ঘটনায়, আমরা কতোটা সংবেদনশীলতা দেখাই। আমরা বলতে সংবেদনশীলতা দেখানোর ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত যারা আছি। এখন ফেসবুকে লাইক বা কমেন্ট দিয়েই নিজেদের সুন্দর তথাকথিত সুশীল সমাজের খাতায় তুলে নেয়া যায় অতি সহজেই।

অন্তত বলতে তো পারি আমিও প্রতিবাদ করেছিলাম। বা দেশ যা নিয়ে মেতেছে বুঝে-না বুঝে আমিও এর সঙ্গে আছি। বাংলা গান না শুনে আমাদের যাদের সরাসরি উচ্চাঙ্গে যাবার মতলব। গত কয়েকদিনে দেখলাম সত্যিই উচ্চাঙ্গের ব্যস্ততা কাটেনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

আসলে নাসিরনগরের মন্দিরে হামলা, গোবিন্দগঞ্জের সাওঁতালদের ভূমি নিয়ে বিরোধ, রোহিঙ্গা এতো ধকলের পর উচ্চাঙ্গ এক ধরনের মন অবকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল। সেই অবকাশের সময়েই ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন ফুলবাড়িয়া ডিগ্রী কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম।

অসময়ে তাকে আত্মহুতি দিতে হলো কিনা সেটাই এখন ভাবছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাসিন্দারা যখন অন্যত্র ব্যস্ত তখন তাঁর চলে যাওয়াটা ঠিক হলো না? নাকি তিনি বা কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকরা এখনও নীল-সাদা-গোলাপী রঙ নেননি বলে তার এই মৃত্যু নিয়ে শিক্ষক সমাজও নিশ্চুপ?

আচ্ছা বেসরকারী কলেজ শিক্ষক সমিতি বলে তো এক বা একাধিক সংগঠন আছে তারা কেন শব্দ করছেন না? তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে তিনি কোনোপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গেই ছিলেন না। ফলে, তার এই মৃত্যু নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য বা রাষ্ট্রের কাছে কেউ কেন প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়ালেন না?

আমরা এমন অনেক শিক্ষককে জানি। যারা জাতির শিক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধা আদায় বা পেয়ে থাকেন। তাদেরকে নানা সময়ে পত্রিকায় বা টকশোতে শিক্ষকের সম্মান(বেতন স্কেলের বাইরে)নিয়ে লিখতে বা কথা বলতে দেখি। কিন্তু এখন কেনো তারা কলম, কীবোর্ড বা বাকহারা হলেন?

রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকেরা দেখে গেল কলেজ জাতীয়করণের দাবিকে দমাতে পুলিশ শিক্ষার্থীদের কিভাবে পেটালো এবং হত্যা করলো একজন শিক্ষককে। শিক্ষকের মৃত্যুর পর ১৪৪ ধারা বলবৎ করে ছাত্র-ছাত্রীদের শেষবারের মতো প্রিয় শিক্ষকের মুখটিও দেখতে দেয়া হলো না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ এমনকি ধর্মঘটের ঘটনাও নতুন নয়। কিন্তু এজন্য একজন শিক্ষকের প্রাণ হারানোর কথা এর আগে শুনিনি। যে দাবিতে শিক্ষার্থীরা পথে নেমেছিল, সেই দাবি পূরণ বা তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে আয়ত্ত্বে আনার অনেক সহজ উপায় ছিল। সেই উপায়ে রক্তপাত ভাবনাতেও আসার সুযোগ নেই।

কিন্তু পুলিশ কেনো এতোটা চড়াও হলো? পেছনে থেকে কারো হুকুম কি পুলিশ বা প্রশাসনকে প্ররোচিত করেছে? রাষ্ট্রের কাছে সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি হওয়া উচিত- আড়ালের সেই হুকুমদাতার মুখোশহীন মুখটি সামনে আনার।

প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষকদের তাদের ন্যুনতম বেতনের দাবি আমরা অভিভাবকহীন ভাবে রাজধানীতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। তাদের উপর পুলিশের নির্দয়, অসম্মানজনক হামলাও দেখেছি। নারায়ণগঞ্জে একজন শিক্ষককে কানধরে উঠ-বস করানোর কাহিনিতো এই সেদিনের। সর্বশেষ শিক্ষকের লাশ উঠলো কাঁধে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনীতিকরণ হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার মুঠোতে এখন। তারা শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তিকেও বাণিজ্য ও ক্ষমতার উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করে সেখানে কর্মি-পরিজনের সমাবেশ ঘটাচ্ছে।

ফলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষকের প্রকৃত প্রতিকৃতি। এই প্রতিকৃ্তিতে হয়তো ধূলি-ঝুল জমেছে। কোথাও অস্পট হয়ে উঠেছে। এখন সেই ধূলি ঝেড়ে, মুখোশ শিক্ষককে বিদ্যায়তন থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রকৃত শিক্ষকদের আবার বিদ্যায়তনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

কারো নয় কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থেই। আমরা শিক্ষকদের লাশের ভার নিতে গিয়েই দেখছি শিক্ষা ও জ্ঞানহীন রাষ্ট্রের দেহ কতোটা কঙ্কালসার।

তুষার আবদুল্লাহ : বার্তা প্রধান, সময় টিভি।