আবারো দেশ অন্ধকারে ডুবলেই হয়তো শুরু হবে তোড়জোড়

0

আজ ১ নভেম্বর। এক বছর আগে এদিন দেশজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। ব্ল্যাক আউট নামে পরিচিত এ দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর বেলা ১১টা ২৭ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে সারাদেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। টানা ১২ ঘণ্টা পুরো দেশে বিদ্যুৎ ছিল না। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যায়।

এক বছরে সুপারিশ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. কায়কাউস আহমদ  বলেন, ‘এক কথায় বিষয়টি বলা সম্ভব নয়। বলার আগে তা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।’ তবে কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

এর আগে ২০০৭ সালে নভেম্বর এবং ডিসেম্বরে দুই দফা ব্ল্যাক আউটের ঘটনা ঘটে। সে সময়ের তদন্ত কমিটির সুপারিশও আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে আবারও এমন বিপর্যয়ের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

তিনবার ব্ল্যাক আউটের পরই তদন্ত কমিটি বলেছে, জাতীয় গ্রিডের অবস্থা দুর্বল। এ গ্রিডের সঞ্চালন ক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। কিন্তু সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেড়ামারা হাইভোল্টেজ ট্রান্সফরমার (ভারত থেকে আমাদনিকরা বিদ্যুৎ এ পথে দেশের গ্রিডে যুক্ত হয়) ১ নভেম্বর বেলা ১১টা ২৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে ট্রিপ করে। এর ১৪ সেকেন্ড পর দেশে ব্ল্যাক আউটের ঘটনা ঘটে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেড়ামারার আগে দেশের অভ্যন্তরে কোথাও লোভোল্টেজের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৫ মিলি সেকেন্ডে। কিন্তু কোথায় আগে ট্রিপ করেছে তা খুঁজে বের করতে পারেনি তদন্ত কমিটি।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে যাচাই করেও কোথায় প্রথম ট্রিপ করেছে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ কেউ স্বীকার করতে চায়নি। আর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ডিজিটাল ডাটা রেকর্ডার না থাকায় কাউকে নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা যায়নি।’

তদন্ত কমিটি ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টারের (এনএলডিসি) আধুনিকায়নের সুপারিশ করে। তারা বলে, এনএলডিসির সফটওয়্যার আধুনিকায়ন করে প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে এক মিলি সেকেন্ডে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা ও প্রতি পাঁচ বছর পর পর এটির আপগ্রেড করা। কারণ, ২০০৬ সালের নকশায় নির্মিত এনএলডিসি ২০০৯ সালে কার্যক্রম শুরু করে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭ হাজার মেগাওয়াট হয়েছে। কিন্তু এনএলডিসির সফটওয়্যার আধুনিকায়ন করা হয়নি।

পিজিসিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, ব্ল্যাক আউটের পরও এনএলডিসি’র আধুনিকায়নে তেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শুধুমাত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনিটর করার জন্য কয়েকটি সিসি টিভি বসানো হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেড়ামারার হাইভোল্টেজ সাবস্টেশনে সয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রীত যার সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিতরণ ব্যবস্থা এতো স্পর্শকাতর নয়। কমিটির সুপারিশে দেশের বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য সাবস্টেশনটিকে কিছুটা সহনশীল করার পরামর্শ দেয়া হয়, যেটিরও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

কমিটি অন্য সুপারিশগুলো হলো, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আন্ডার ফ্রিকোয়েন্সি রিলের উন্নয়ন করা, জেনারেশন ইউনিট এবং ফিডারের ফ্রিকোয়েন্সি রিলের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা, আগের গ্রিড বিপর্যয়ের পর করা সুপারিশের বাস্তবায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, এনএলডিসিতে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা, জিপিএস টাইমারের ব্যবস্থা করা, প্রত্যেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজিটাল রেকর্ডিং প্রথা চালু করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রে খুচরা যন্ত্রাংশ প্রস্তুত রাখা, জোনভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর ব্ল্যাক স্টার্ট (ব্ল্যাক আউটের পর পুনরায় চালু করা) এর ব্যবস্থা রাখা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা চালু রাখতে নিজস্ব জেনারেটর ব্যবস্থা করা পরামর্শও দেয়া হয়।

এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ারগ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী বাংলামেইলকে জানান, স্বল্প মেয়াদী সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আন্ডার ফ্রিকোয়েন্সি রিলের সংখ্যা বাড়নো হয়েছে। আগে গ্রিডের ৩০টি স্থানে ছিল এখন তা ৭০টি স্থানে বসানো হয়েছে। মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর রিলে ব্যবস্থা সহনশীল করা হয়েছে। কিছু কর্মীকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আর বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে না বলে বেরুনী দাবি করেন।