আবারও অশান্ত গুজরাট, দাঙ্গার আশংকা

0

ঢাকা: ২০০২ সালের কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গার পর প্যাটেল সম্প্রদায়ের কথিত ‘কোটা অধিকার’ আদায়ের দাবিকে কেন্দ্র করে ফের অশান্ত গুজরাট।

নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য মঙ্গলবার রাস্তায় নামে প্যাটেলরা। সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়ে নিমিষেই। ভস্মীভূত হয় শত শত বাস, সরকারি সম্পত্তি। এমনকি আগুন দেয়া হয় স্থানীয় বিধায়ক এবং এমপিদের বাড়িতেও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। সংঘর্ষে মৃত্যু হয় এক পুলিশ সদস্যসহ আটজনের। অগ্নিসংযোগ এবং অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানী আহমেদাবাদ ও বন্দরনগরী সুরাটসহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জারি করা হয় কারফিউ।

এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে পতিদর আনামত আন্দোলন সমিতি সংক্ষেপে পিএএএস। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ২২ বছর বয়সী তরুণ হার্দিক প্যাটেল। তার ডাকে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) লাখ লাখ প্যাটেল নেমে আসে রাজপথে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, কে এই হার্দিক প্যাটেল? তার শক্তির উৎসটাইবা কি?

শিক্ষাদীক্ষা,ব্যবসা বাণিজ্য সহ অন্যান্য সবক্ষেত্রেই ভারতের যে কোনো জনগোষ্ঠীর থেকে এগিয়ে আছে প্যাটেল সম্প্রদায়। গুজরাটের ৬ কোটি ৩০ লাখ জনগোষ্ঠীর ১২-১৫ শতাংশ এ সম্প্রদায়ের। গুজরাটের টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হীরা কাটার ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য তাদের। পাশাপাশি কৃষিযন্ত্র ও পণ্যের ব্যবসায়ী হিসেবে বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি গুজরাটের গ্রামীণ সমাজের ওপরও তাদের আধিপত্য প্রবল। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে ১৭ শতাংশই প্যাটেল।
তাই তারা যখন ‘পিছিয়ে পড়া’ সম্প্রদায় হিসেবে কোটার দাবি তুলে আন্দোলনে নামে তখন এ ব্যাপারে প্রশ্নের উদ্রেক হওয়াই স্বাভাবিক।

একই সঙ্গে গুজরাটের রাজনীতিরও অন্যতম নিয়ন্ত্রক প্যাটেলরা। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী আনন্দিবেন প্যাটেল সহ তার মন্ত্রিসভার সাতজন সদস্য প্যাটেল সম্প্রদায়ের। গুজরাটের ১২০ জন বিজেপি বিধায়কের মধ্যে ৪০ জনই প্যাটেল।

দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি’র ভোটব্যাংক বলে পরিচিতি পেয়ে আসছে প্যাটেলরা। মূলত তাদের ওপর ভর দিয়েই গুজরাটে এতদিন ধরে ক্ষমতাসীন বিজেপি।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বিজেপি সরকারের আমলে, বিশেষ করে যখন গুজরাটেরই একজন নেতা নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী, এবং তাদের সম্প্রদায়ের অানন্দিবেন প্যাটেল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঠিক তখন কেন রাজপথে নামলো প্যাটেলরা? হার্দিক প্যাটেলের আকস্মিক উত্থানও কম অবাক করেনি সবাইকে।

অনেকে মনে করছেন, পিএএএস গঠনের পর মাত্র এক মাস না যেতেই গুজরাট কাঁপিয়ে দেওয়ার পেছনের রহস্য আর কিছুই নয়, বৃহৎ কোনো শক্তি ক্রীড়নক হিসেবে এখানে কলকাঠি নাড়ছে।

আহমেদাবাদের কাছে বিরামগমের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হার্দিক। আহমেদাবাদের সাহাজানন্দ কলেজ থেকে ৫০ শতাংশেরও কম নম্বর পেয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক শেষে রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বাবার কৃষি যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ও হাত লাগিয়েছিলেন। তার বাবা ভারত প্যাটেল বিজেপি’র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

হার্দিক প্যাটেল নিজেও ছিলেন সরদার প্যাটেল সংঘের (এসপিজি) একজন স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। এসপিজিতে থাকাকালেই গত জুলাই মাসে পতিদর আনামত আন্দোলন সমিতি (পিএএএস) গড়ে তোলেন হার্দিক।

যে সরদার প্যাটেলের নামে এসপিজি’র নামকরণ সেই সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলকে গুজরাটের প্যাটেল সম্প্রদায়ের আইকন হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি ভারতের ডানপন্থি হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিরও অন্যতম জনক।

জন্মলগ্ন থেকেই এসপিজি ভারতের উগ্রহিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে আসছে। গুজরাটের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার অন্যতম নাটের গুরু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গেও রয়েছে তাদের দহরম মহরম। সেই সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) নেতা প্রবীণ তোগাড়িয়ার সঙ্গে হার্দিকের তোলা ছবি পেছনের অদৃশ্য শক্তির ব্যাপারে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ইদানীং বিভিন্ন ইস্যুতে প্রবীণ তোগাড়িয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী আনন্দিবেন প্যাটেলের সম্পর্কের টানাপোড়েনের খবর কারও অজানা নয়। কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, বিশাল এই কাণ্ড ঘটিয়ে দেওয়ার পেছনের ক্রীড়নক প্রবীনও হতে পারেন।

কারণ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস ও ভিএইচপিকে এড়িয়ে চলছেন মোদি। চেষ্টা করছেন গুজরাট দাঙ্গার কলঙ্ক মোচনের। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্কন্নোয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এছাড়া রামমন্দির এবং অন্যান্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইস্যুতে সংঘ পরিবারের মতে সায় দিচ্ছেন না মোদি। ফলে মোদিকে একটু সমঝে দিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি যদি প্যাটেলদের উস্কানি দেয় তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এদিকে পতিদররা শুধু নিজেদের কোটা অধিকারই দাবি করছে না একই সঙ্গে মুসলিম, দলিত সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত কোটার বাতিলও দাবি করছে। এছাড়া গুজরাটের পতিদররা আগে থেকেই আরএসএস ও ভিএচপি প্রভৃতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাশাপাশি যেভাবে ‍সাংগঠনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে প্যাটেলরা রাজধানী আহমেদাবাদে মঙ্গলবার প্রায় ৫ লাখ লোকের শোডাউন দেখালো তাতে তাদের আন্দোলনের পেছনে এসব উগ্রপন্থি ধর্মীয় সংগঠনের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে পতিদরদের দাবি, ৠালি, সংঘর্ষের ব্যাপকতা বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায় তাদের আন্দোলনে ঢালা হচ্ছে কোটি কোটি রুপি, পেছনে রয়েছে কোনো সংগঠিত শক্তির আশীর্বাদ।

পর্যবেক্ষকদের মতে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সঙ্গে অনেক কিছুরই মিল রয়েছে মঙ্গল ও বুধবারের সহিংসতার।

এ পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন হার্দিক প্যাটেলকে সামনে রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে হিন্দুত্ববাদীরা। উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই বার্তা দেয়া যে তাদের অগ্রাহ্য করার পরিণাম ভালো হবে না।

একই সঙ্গে সংখ্যালঘু এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য প্রণীত কোটা পদ্ধতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।