আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ

0

অনিক খানঃ  প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় নেয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের ওপর পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করেছে। এতে অভিভাবকসহ পাঁচজন আহত হলে তাদেরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অংশ নিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ওদিকে মেডিক্যাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করেছে বেশ কয়েকটি বাম ছাত্র সংগঠনের দু’টি জোট। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সব মেডিক্যাল কলেজে ক্লাস বর্জনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ বুধবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান করে সমাবেশ করেন মেডিক্যাল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা।

এসময় ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় নেয়ার দাবিতে তারা বিভিন্ন ধরণের স্লোগান দেন এবং নানা ধরণের ব্যানার, প্লাকার্ড বহন করেন। দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার থেকে একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সড়ক অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। সড়ক অবরোধের ফলে ওই সড়ক দিয়ে সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংহতি জানিয়ে অংশ নেন। আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্যের নেতাকর্মীরা। জানা গেছে, শাহবাগ থেকে পুনরায় শিক্ষার্থীদের মিছিল মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের দিকে রওনা হয়। মিছিলটি কারওয়ান বাজারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পুলিশ বাঁধা দেয়। প্রথম দফা ব্যারিকেড ভেঙে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে পৌঁছলে সেখানে পুনরায় পুলিশ বাঁধা দিলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান শুরু করেন। এসময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এতে অভিভাবকসহ অন্তত পাঁচজন আহত হলে তাদেরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আন্দোলনকারীরা পুনরায় মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে ফিরে যান। আহতরা হলেন- আরাফাত (২০), জাহিদ হোসেন (২১), তানভীর আহমেদ (২০), অভিভাবক আশফাক কামাল (৫৭) ও ডা. বোরহান উদ্দিন (৫০)। আহত আরাফাত বলেন, শহীদ মিনারে সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে তারা শাহবাগে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে মিছিল নিয়ে তারা কারওয়ান বাজারের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলনরতদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের নিকট দাবি করেছেন। ওদিকে বিকেলে শহীদ মিনারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা আগামীকাল বৃহস্পতিবার সব মেডিক্যাল কলেজে ক্লাস বর্জনের ডাক দিয়েছেন। কর্মসূচি ঘোষণা করেন সলিমুল্লাহ মুসলিম মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজ্জাকুল ইসলাম।

59786_190

একই সাথে আরেক সংবাদ সম্মেলন থেকে আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের আহবায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবেন তারা। এরপর শহীদ মিনারে এসে নতুন কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা করেন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট : মেডিক্যাল ও ডেন্টালের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে এবং তা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেয়াসহ চারদফা দাবিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য। ধর্মঘটে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগেরই ক্লাস হয়নি। তবে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু বাসও চলাচল করেছে। ধর্মঘটের সমর্থনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন, কার্জন হলসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনে তালা লাগিয়ে দেন জোট দু’টির নেতাকর্মীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ প্রক্টরিয়াল সিকিউরিটি টিমের সহায়তায় সেগুলো ভেঙে ফেলেন। অধ্যাপক এ এম আমজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

সকালে কয়েকটি ভবনের তালা ভেঙে ফেলা হয়। পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা এবং কিছু বিভাগের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে এসময় জানান তিনি। আন্দোলনকারীরা সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মূল ফটকে অবস্থান নেন। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কলা ভবনের মূল ফটকের সামনে সমাবেশে মিলিত হন। এসময় প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এখন সব ধরনের পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দাবি করেন বক্তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন জোটের নেতৃবৃন্দ। সমাবেশে ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাবিব রুমন, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জি এম জিলানী শুভ বলেন, ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখা সাধারণ সম্পাদক তুহিন কান্তি দাশ, ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের হামলার প্রতিবাদ ছাত্রদলের : আন্দোলনরত মেডিক্যাল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। আজ এক বিবৃতিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান এক বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলা সরকারের বর্বর আচরণের বহি:প্রকাশ বলেও মন্তব্য করেন।

নেতৃদ্বয় বলেন, এটা দিবালোকের মত পরিস্কার যে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। সে জন্যই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই আন্দোলন করছে। এই আন্দোলনে দেশের ছাত্রসমাজ, অভিবাবক, শিক্ষক ও চিকিৎসকবৃন্দেরও সমর্থন রয়েছে। এমতবস্থায় তাদের দাবি মেনে না নিয়ে তাদের ওপর একের পর এক পুলিশি হামলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তারা বলনে, এ ঘটনায় পুরো জাতি স্তম্ভিত। যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘটনার পর দু:খ প্রকাশ করে নতুন করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেও তাদের নায্য অধিকার আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি ছাত্রী বোনদেরকেও রাজপথে টেনে-হেচড়ে অপমান করা হচ্ছে। নেতৃদ্বয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বিএনপি সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশ থেকে নকল উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস হয়নি। নেতৃদ্বয় দৃঢ়তার সাথে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের যে কোনো ন্যায্য দাবির সাথে অতীতেও ছিল এবং বর্তমানেও থাকবে। ইতোমধ্যে ছাত্রদল মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশব্যাপী জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তারা অবিলম্বে এই অবৈধ ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার আহবান জানান এবং ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ওপর পৈচাশিক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান।