আওয়ামী লীগের যুদ্ধাপরাধীনামা – ২

0

অ্যাডভোকেট নয়ন খান

গত পর্বে পুতুলের দাদা শ্বশুর নুরু মিয়ার যুদ্ধাপরাধ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে।এইবার আলোচনায় থাকবে শেখ সেলিমের বেয়াই মুসা বিন শমসের।

শেখ সেলিমের বেয়াই “মুসা বিন শমসের”

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন দৈনিক জনকন্ঠে ‘তুই রাজাকার’ শীর্ষক এক ধারাবাহিক সিরিজে ফরিদপুরের কুখ্যাত রাজাকার মুসা বিন শমশেরের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে লোমহর্ষক কাহিনী ছাপা হলে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জনকন্ঠের সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের ওপর নারকীয় হামলা চালায় মুসা বিন শমশেরের ভাড়াটে গুন্ডারা। পরে গুরুতর আহত ওই সাংবাদিকের পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। শুরু হয় তার পঙ্গুজীবন। আরো পরে শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিয়ে আলোচনায় আসে মুসা বিন শমশের। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা লন্ডনের হ্যামারস্মিথ এলাকায় সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন।

মুসা বিন শমসের ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার আকরাম কোরায়শী ও আরো অনেক সৈন্য নিয়ে যখন ফরিদপুরের মহিম স্কুল সংলগ্ন ধর্মশালায় ঢুকে তার কেয়ারটেকার কেষ্টমন্ডলকে হত্যা করে মন্ডলের চার কন্যা ননী, সোহাগী, বেলী ও লতাকে ধর্ষনের পর ধর্ষন করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। ওই হানাদার আর্মি অফিসার ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার মদন গোপাল আঙিনা এলাকার মেয়ে কমলা ঘোষকে ধর্ষন করে বীরত্বের বুক ফুলিয়ে চলে গিয়েছিল।

ননী ও বেলীকে পাকিস্তানী আর্মিরা তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই চার বোন আর তাদের মা মাখন বালার স্থান হয় ফরিদপুরের পতিতা পল্লীতে। ওদিকে কমলা ঘোষের স্বামী জানতে পারে তার স্ত্রী’র লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হবার ঘটনা । স্বভাবতই এই স্বামী বঙ্গ জননী কমলাকে আর ঘরে নেয় নি । ফলশ্রুতিতে কমলা দেশের বাইরে আশ্রয় নেয় সময়ের পরিক্রমা। এখন তিনি দেশের বাইরে বেঁচে আছেন একা হয়ে ।

ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তালিকায় ফরিদপুর জেলার প্রধান ১৩ জন রাজাকারের মধ্যে তার নাম আছে শুরুর দিকেই। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ঘৃন্য রাজাকার মুসা বিন শমশের ওরফে নুলা মুসা নিজেকে রীতিমতো ‘মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক’ হিসেবে দাবি করে বসে আছে! ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’র আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান আওয়ামী লীগে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার বিষয়ে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো, দলের মর্যাদা অক্ষুণ্ন ও নিষ্কলুষ করার জন্য নিজেদের উদ্যোগেই জরুরি ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি করা উচিত।’ (আমাদের সময়, ২৮ এপ্রিল, ২০১০)

১৯৭১ সালের আগে এই নুলা মুসা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পক্ষে মাইকিং করেছিলো । ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনেও তার ভুমিকা ছিলো বলে কথিত রয়েছে । ২১ শে এপ্রিল যখন ফরিদপুরে পাক সেনারা ঢোকে তখন এই নুলা মুসাই পাক আর্মিদের স্বাগত জানিয়েছিলো । ২২ শে এপ্রিল ১৯৭১ সালে এই আকরাম কোরায়শীর সাথে এক বৈঠকে এই নুলা মুসাকে দেখা যায় ।এই ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী ছিলেন ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম আবু ইউসুফ সিদ্দীক পাখি ।

নুলা মুসা কিংবা প্রিন্স মুসাঃ যে রাজাকারের সম্পদ আর ক্ষমতার কথা শুনে আপনি চমকে যাবেন।

বাংলাদেশের ধনাঢ্যব্যবসায়ী ড. মুসা বিন শমসেরের ৭ বিলিয়ন ডলারের একাউন্ট ফ্রিজ করেছিল সুইস ব্যাংক। গতবছরের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে অনিয়মিত লেনদেনের অভিযোগ এনে এ হিসাব জব্দ করে সুইস কর্তৃপক্ষ। এনিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তার লন্ডনস্থ আইনজীবিরা। এবিশাল অর্থ তিনি গড়ে তুলেছেন আন্তর্জাতিক অস্ত্র, তেল ও ক্ষমতার দালালী (পাওয়ার ব্রোকারেজ) করে। বাংলাদেশে তার ড্যাটকো নামে জনশক্তি রফতানির একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ড. মুসা ১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম তার বন্ধু ব্রিটেনের বিরোধী দলীয় নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) টনিব্লেয়ারের নির্বাচনী ফান্ডে ৫০ লাখ পাউন্ড অনুদান দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বিশ্ব দরবারে আলোচনায় উঠে আসেন। একজন বিদেশী নাগরিক হওয়ায় টনিব্লেয়ার অবশ্য সে অনুদান গ্রহণ করেননি। তার পরে নানা কর্মকান্ডের মাধ্যমে এ ব্যবসায়ী মাঝে মধ্যেই বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনা বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছেন। লোক মুখে আছে তার বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক চমকপ্রদ কাহিনী। ১৯৯৭ সালে ড. মুসা বিন শমসের তার ইউরোপিয়ান সদর দপ্তর হিসেবে একবার আয়ারল্যান্ডের কালকিনি দুর্গ কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সফল হননি।

“সুইস ব্যাংকে আটকা ৫১ হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে আনতে প্রিন্স মুসার লবিং” গত ২০ ডিসেম্বর ২০১০ এর মানবজমিন প্রধান শিরোনাম এটি। এক্সক্লুসিভ সংবাদটি করেছে নাশরাত চৌধুরী। প্রিন্সমুসা বাংলাদেশী নাগরিক। তার জীবনের সাফল্যের কাহিনী তুলে ধরেছেন নাশরাত। মুসা বর্তমান বাস করছেন গুলশানে অবস্থিত তার প্রাসাদোপম বাড়িতে। এ বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই পার্টি থাকে। সেখানে সবসময় তার দেশি বেদেশি হাইপ্রোফাইল মেহমানরা উপস্থিত থাকেন। পার্টিতে খাবার পরিবেশনের জন্য রয়েছে প্রশিক্ষিত কয়েক ডজন সেফ। এরা সবাই রান্না-বান্না ও পরিবেশনার উপর উচ্চ ডিগ্রিধারী।